শ্যামলী
নুরুল আলম (খােশনূর)
উৎসর্গ-
এই উপন্যাসটি আমার প্রাণ প্রিয় প্রথম সন্তান।
মরহুম খােশনূর আজিমকে।
শ্যামলী
নুরুল আলম (খােশনূর)
উৎসর্গ
এই উপন্যাসটি আমার প্রাণ প্রিয় প্রথম সন্তান।
মরহুম খােশনূর আজিমকে।
প্রথম প্রকাশ ঃ ১৫ এপ্রিল ২০১৮ খ্রিঃ।
প্রকাশক ঃ মােঃ মেহেদী হাছাস।
প্রচ্ছদ ও অলংকারে ঃ আল-আমিন (আযম) জেয়াদ্দার,
গ্রাফিক্স ডিজাইনার, মাহাবুব অফসেট প্রেস,
ঝিনাইদহ।
কম্পিউটার বর্ণ বিন্যাস ঃ মােঃ হাবিবুর রহমান জেয়াদ্দার,।
মাহাবুব অফসেট প্রেস, ঝিনাইদহ।
-- ঃ সর্বসত্ব লেখকের।
মূদ্রণে ঃ মাহাবুব অফসেট প্রেস, ঝিনাইদহ।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ঃ নাত্নি ও মােছাঃ অন্তরা বেগম
ঃ স্ত্রী মােছাঃ নাজমুন নাহার (খুশি)
ঃ এডঃ আব্দুর রশিদ
ঃ ও শফি উদ্দীন আহাম্মেদ বিশ্বাস
ঃ মােঃ ওয়াছেল আলী জোয়ার্দার
ঃ মােঃ আতিয়া রহমান ।
ঃ সৌরভ
ঃ আনােয়ার হােসেন
ঃ দিলারা খাতুন
ঃ আযম জেয়াদ্দার
মূল্য ঃ দুইশত টাকা মাত্র (২০০/=)
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর।
এই পৃথিবীতে মাতা-পিতা ভাই-বােন খালা, ফুফু, চাচাও মামা এরা
সকলে না থাকলেও এদের মধ্যে কেউ না কেউ থাকে, কিন্তু শ্যামলীর
আপন বলতে এই সুন্দর পৃথিবীতে আর কেউ নেই। বড়ই খারাপ
লাগছিল, একা একা ভাবছিল, এমনি সময় আজানের ধ্বনি ভাসিয়া।
আসিল শ্যামলীর কানে।।
তার পর তাড়াতাড়ী উঠিয়া পিতিকে ডাকিয়া কহিল- সব ঘরে কি
আলাে জ্বালিয়ে দিয়েছ?
প্রদিপ হাতে, কাছে আসিয়া কহিল পিতি- হাঁ বুবু সব ঘরে আলাে।
জ্বালিয়ে দিয়েছি শুধু বাকি ছিল তােমার পড়ার ঘরে আলাে দিতে।
অজুর পানি দিয়েছি।” পড়ার ঘরে প্রদিপ রাখিয়া নিজে চলিয়া গেলাে।
শ্যামলী আবার কাছে ডাকিয়া কহিল - একটা কথা মনে রেখ, আমার
নামাজ ঘরে আলােটা প্রথম দেবে, তার পর অন্য ঘর। কথাটা মনে
থাকবে তাে?
একটু চুপ থাকিয়া পিতি বলিল:- আর ভুল হবে না।
একটু রাগ করে শ্যামলী বলিল- আমি অনেকবার দেখেছি তুমি ভুল।
করেছ। আজও সেই অবহেলারই ভুল। এর আগে অনেক বার বলেছি।
যে সূর্য অস্ত যাবার আগেই ফটকের দরজা বন্ধ করে দেবে। প্রতি দিনের
ন্যায় আজও এখনও দেওয়া হয়নি। এমনি করে ভুল আর কোন দিন।
করবে না। যাও আগে ঐ দরজাটা দিয়ে এস। ভুল করলে ভুলের মাসুল।
দিতে পারবে না। কথা গুলাে বলিয়া শ্যামলী নামাজ ঘরে চলিয়া গেল।
পিতি দরজা বন্ধ করিতে গেল। দরজার সামনে হাজির হলাে। এমনি।
সময় হাজির হলাে সাজু। সাজু আর পিতির মুখােমুখি দেখা হলাে কিন্তু
পিতি সাজুকে ভিতরে প্রবেশ করিতে দিলাে না। দরজা বন্ধ করিয়া
দিল।।
**************************************
সাজু বল্লো- দরজা বন্ধ করাে না, আমি ভিতরে যাব। পিতি একটু
কড়াভাবে কথা বলিল মালিকের হুকুম, সূর্য অস্ত যাবার পর
শ্যামলী-০১ পৃষ্ঠা ১৫৬
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
বাহির হতে ভিতরে কেহই প্রবেশ করতে পারবে না। এর পর মালিকের।
হুকুম ছাড়া খুলতে পারবাে না। আমার কিছুই করনীয় নেই।
সাজু বাহির হতে বল্লো- আচ্ছা তােমার মালিকের কাছে গিয়ে বলাে,
বাহির হতে এক জন অতিথী এসেছেন। আমার দেখা করতেই হবে।
:-বুবু এখন নামাজ পড়ছে, একটু সময় লাগবে, তার পর যদি অনুমতি
দেয়, তবে যেতে পারবে। কথা গুলাে বলিয়া চলিয়া গেলাে পিতি নিজের
অবস্থানে। চায়ের পানি গরম করতে, সাজু অপেক্ষায় রইলাে বহিরে।
এ দিকে শ্যামলীর নামাজ পড়া শেষ হয়ে গেলাে।
তার পর খাবার টেবিলে গিয়ে বসিল।
পিতি চা নিয়ে হাজির, কহিল- বুবু চা নিন, বাহিরে একজন লােক
আপনার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে, আসিতে অনুমতি চাইছে।
একটু চুপ থাকিয় শ্যামলী কহিল- যেই হােক তাকে বলে দে আজ আর
দেখা করবে না। আগামি কাল দেখা করবে একান্ত দরকার হলে সকালে
আসতে বলবি।
পিতি সাজুর খবরটা দিতে গেলাে, ও দিকে সাজু অপেক্ষায় আছে, পিতি
সাজুর কাছে গিয়ে বললাে- বুবু বলেছে আগামিকাল খুব সকালে ছয়টার।
আগেই আসতে হবে।
সাজু একটু ভাবিয়া কহিল- তােমার বুবুকে বলবে সাজু এসেছিল,
আগামি কাল আসতে পারবে না, সামনে এই দিনে আসবে, কথা গুলাে।
বলিয়া সাজু চলিয়া গেল।
পিতি ফিরিয়া আসিয়া শ্যামলীর কাছে গিয়া বলিল- আগামি কাল
আসতে পারবে না। বললাে সামনের এই দিনে আসবে। বলে চলিয়া
গেলাে।
*****************************************
শ্যামলী চিন্তায় পড়িয়া গেল কহিল কে এসেছিলাে?
পিতি আস্তে আস্তে বলিল- তার নাম সাজু।।
শ্যামলী কহিল- তাের কাজে চলে যা।।
শ্যামলী-০২ পৃষ্ঠা ১৫৬
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
পিতি বলিল- বুবু জান সাজুটা কি হয় তােমার?
শ্যামলী দুঃখ ভরা মনে কহিল- বললাম তাে তাের কাজে যা, সব সময়।
বড়দের মুখে মুখে কথা! আর কোন কথা না বলিয়া পিতি চলিয়া গেল।
শ্যামলীর দুই চোখে অশ্রু নামিয়া আসিল, সাজু এসেছিল কিন্তু আমার
সাখে দেখা না করে চলে গেল। ভুল তাে আমিই করেছি, সাজু অনুমতি
চেয়ে ছিল কিন্তু আমিই তার অনুমতি দেইনী, তাই সে চলে গেলাে।
আমি আসতে না বল্লেও সেতাে আসতে পারতাে! আমার কাছে আসতে।
তার কোন বাধা ছিল না। কিন্তু বাধা দিয়েছি বলেই চলে গেলাে! পিতির
কাছে বলে গেছে সামনের এই দিনে আসবে ঐ দিনে সাজুর কাছে ক্ষমা
চেয়ে নেবাে, সাজু এখন এ দেশের ভালাে একজন ডক্টর। আজ কত
সুনামের পাত্র, তাকে আমি ফিরিয়ে দিলাম, আমি বড়ই ভুল করেছি, যে
ভুলের আর শেষ নেই। আমি বি.এ. পাস করার পর সাজু জার্মান চলে
গেলাে। আমি বি.এ. পাস করে বসে আছি, আব্বা মারা যাবার পর সমস্ত
ভার আমার উপরই আসলাে তায় আর বিশ্ব বিদ্যালয়ে যেতে পারলাম
। আব্বার সহযােগিতায় সাজু ডক্টর পড়তে যেতে পারলাে, আর
সাজুর চেষ্টা ছিলাে তায় ডক্টর পড়তে যেতে পারলাে। এমনি করেই
ভাবিতে লাগিল শ্যামলী।
***************************************
সাজু বাড়ী ফিরার পথে, পথ চলতে চলতে হােচট খেয়ে পড়ে গেলাে,
বলে উঠলাে মা গাে, শ্যামলীর কথা চিন্তা করতে গিয়ে পথ চলার দিকে
তেমন আর খেয়াল নেই। অন্ধকার রাত, তা ছাড়া এই পথে অনেক দিন।
চলিনী সাজু। পথ চলতে চলতে সাজু ভাবছিল শ্যামলীর কথা। কত দিন।
দেখিনী, হয়তাে আগের চেয়ে এখন চেহারাটা ভালই হয়েছে, না কি।
আগের মতই আছে জানি না। শ্যামলীকে দেখতে আমার হৃদয় ছটফট
করছে আমি কিছুতেই শান্ত হতে পারছি না। আমি জানবাে কেমন করে
সেই ছয় বৎসর আগে বিদেশ চলে গিয়েছি। এক দিন, এক মাস, এক
বৎসর এমনি করে কয়টা বৎসর পার হয়ে গেলাে।
শ্যামলী-০৩ পৃষ্ঠা ১৫৬
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
তার পর দেশে ফিরলাম পথ চলতে চলতে নানা কথা সাজুর মনের।
ভিতরে ভেসে আসছিল, এমনি সময় ঐ পথ ধরে আসছিল, অবােধ বড়
সাদা মানুষ। শ্যামলীদের বাড়ীতে থেকে বড় হয়েছে, চেনা মানুষ পেলে
। খুব আদর করে, সে নিজেও আনন্দ পায়। অবােধকে দেখিয়া চিনিয়া।
' ফেলিল সাজু কহিল - আরে অবােধ ভাই রাত্রি বেলা কোথায়।
গিয়েছিলে? আমি যে তােমার চিন্তেই পারছি না তােমার চেহারার এত
পরিবর্তন!
আরে আমায় তুমি চিন্তে পারছ না, আমি সাজু।
-ওহ্ সাজু ভাই, তুমি কেমন আছ? তােমায় যে আমি চিন্তেই পারছি না।
:-চিন্তে পারবে, চিন্তে পারবে- আমি তােমাদের আজো ভুলি নাই,
তােমাদের আমি কোন দিন ভুলব না, আচ্ছা অবােধ ভাই শ্যামলী কেমন আছে?!
:-শ্যামলী বুবু খুব ভালই আছে আগামীকাল ঢাকায় যাবে তায় ধুপা বাড়ী।
কাপুড় আন্তে গিয়েছিলাম। সাজু ভাই তুমি কোথায় গিয়েছিলে?
:-আমি একটু গ্রামটা ঘুরে ফিরে দেখে বেড়াচ্ছি।
:-চলাে সাজু ভাই শ্যামলী বুবুর সঙ্গে দেখা করে, রাত্রি আমাদের বাড়ী
থেকে সকালে আসবে, আমার আজ খুব ভালাে লাগছে তােমাকে কাছে।
পেয়ে।
-না আমি আজ আর যাবাে না, তােমার শ্যামলী বুবু ঢাকা থেকে ফিরে
আসলে দেখা করতে যাব, আজ থাক অনেক রাত হয়েছে, তুমি যাও।
অন্ধ কারে একা যেতে পারবে তাে? আমি একাই যেতে পারবাে। চলাে
:-সাজু ভাই তােমার বাড়ী পৌছে দিয়ে আমি একাই বাড়ী যেতে
পারবাে।
-না-না আমি একাই যেতে পারবাে, অসুবিধা হবে না, অবােধ ভাই
তুমি বাড়ী চলে যাও। তােমার শ্যামলী বুবু যে দিন ঢাকা থেকে বাড়ী
আসবে আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে আসবাে।
:-একটু চুপ থাকিয়া অবােধ কহিল- আচ্ছা তায় ভালাে, অন্ধকার রাত
তাড়াতাড়ী চলে যাও সাজু ভাই। সাজু তার নিজের বাড়ীর দিকে
পা
শ্যামলী-০৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
বাড়ালাে। অবােধ ও তার বাড়ীর পথে পা বাড়ালাে।
****************************************
সেই ছােট্ট বেলা থেকে অবােধ শ্যামলীদের বাড়ীতে থাকে এই যেন তার
নিজের বাড়ীর মত সব কিছু আপন করে রাখে। এই পথ চলতে চলতে
অবােধ অনেক কথাই মনে মনে বলছে- শ্যামলী বুবুর কাছে গিয়ে।
বললাে সাজু ভাই এসেছে। আমার সঙ্গে দেখ হয়েছিলাে ঐ রাস্তার
মােড়ে, এমনি করে ভাবতে ভাবতে অবােধ বাড়ী পৌছে গেলাে। বাহির
হতে ডাক ছাড়লাে, অবােধ কহিল- পিতি দরজা খুলে দে পিতি ভিতর
থেকে সাড়া দিয়ে কহিল- আসছি। অবােধ সােজা চলে গেলাে শ্যামলীর।
কাছে। শ্যামলী কহিল- তাের এত রাত হয়ে গেলাে কেনরে?
:-অবােধ কহিল- রাত হবেনা! সাজু ভায়ের সঙ্গে গল্প করছিলাম, বুবু।
জান, সাজু ভায়ের দেখলে এখন তুমি চিন্তেই পারবে না! আমিও চিন্তে।
পারছিলাম না। আগে যেমন ছিলাে এখন আর তেমন নেই, সাজু ভাই
যদি আমার সঙ্গে কথা না বলতাে তবে আমিও কথা বলতাম না, বড়।
ভালাে মানুষ, মনে কোন অহংকার নেই, এমন মানুষ আর হয় না।
:- একটু খানি চুপ থাকিয়া শ্যামলী কহিল- সাজু চলেই গেলাে--------
আর আসতে চাইল না? আসতে চাইবে না কেন, কবে যেন আসতে
চাইল আগামি দিনের কথা বললাে কিন্তু সেই দিনের কথা আমি মনে
করতে পারছি না, আসতে যখন চেয়েছে ঠিকই আসবে সাজু ভাই, কোন
দিন মিথ্যা বলে না।
-এমনি সময় পিতি আসিয়া কহিল- বুবু জান খাবার কি টেবিলে রাখব?
:-রান্না যদি হয়ে যায় তবে তাড়া তাড়ী টেবিলে নিয়ে আয়।।
:-যায় বলিয়া, পিতি খাবার টেবিলে খাবার দিতে গেলে।।
:-অবােধকে কহিল শ্যামলী- একটা কথা শােন আগামি কাল আমার
ঢাকা যাওয়া হবে না, তুই ভাের বেলা সাজুর কাছে যাবি। বলবি আমার।
কথা। শরীর খারাপ হয়েছে, না গেলেই নাই বুঝলী?
:-বুবু জান তােমার শরীর খারাপ? আমি এখনী যাচ্ছি।
শ্যামলী-০৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
না, তাের এখন যেতে হবে না, ভাের বেলা যাবি।
-বুব জান সারা রাত তুমি জ্বরে কষ্ট করবে আর আমি ভােরে যাব, না।
তা হয় না, আমি এখনী যাব।
-এই জন্য তাের নাম রেখেছে অবােধ এক বার কথা পেলে পেড়ে।
বসিস, সারা দিন বলেও ফুরায় না, আমি যা বলছি তুই তায় করবি, মনে
থাকবে তাে?
-ঠিক আছে বুবু জান, তুমি যা বলবে আমি তায় করবাে।
:-পিতি খাবার টেবিলে রাখিয়া কহিল- বুবু জান খাবার টেবিলে এনেছি,
খাবে চলাে।
:-চেয়ার ছাড়িয়া শ্যামলী কহিল- তােরা খেয়ে নিগা, যদি কিছু দরকার
হয় আমি নিজেই নেব, আজ আর আমার কাছে আসতে হবে না, মনটা
ভালাে নাই, ঐ বই গুলাে আলমারিতে রেখে যা।
:-পিতি বই আলমারিতে রেখে চলিয়া গেলাে, শ্যামলী তার নিজের
ঘরে গিয়া শুইয়া পড়িল, সাজুকে নিয়া চিন্তা করিতে লাগিল!
*****************************************
সাজু বাড়ী আসিয়া সরাসরি তার সুবার ঘরে গিয়া বসিল, একা একা
বড়ই ভাবনায় পড়িল।
:-কিছুক্ষন পর ফাতেমা আসিয়া সাজুকে কহিল- সাজু এত রাত হয়ে
গিয়েছে কোথায় ছিলি এতক্ষন?
-মা আমি আজ কত দিন পর দেশে ফিরলাম, তাই বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে
দেখা সাক্ষাত করতে এত রাত হয়ে গেলাে, ভাবছি আগামি কাল আবার
ঢাকায় যেতে হবে।
:-ছয়টা বছর পর বাড়ী আসলি, এই ছয়টা বছর আমার কাছে কি মনে
হতাে জানিস? আমার মনে হতাে যেন কত কাল তাের দেখিনি, আজ
কয়টা দিন তােকে কাছে পেয়ে আমি যে কি পেয়েছি! সে আমি আর
সৃষ্টিকর্তা ছাড়া, আর কেহই বুঝবে না। তুই যে আমার সব কিছু বাবা।
:- মা, আমি কি আগের মত সেই ছােট্ট খােকা আছি? যে তােমার।
আচলছায়াই না থাকলে হারিয়ে যাব, কোথায় জার্মান, আর কোথায়।
শ্যামলী-০৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
বাংলাদেশ, ঐ সুদুর জার্মান থেকে তােমার বুকে ফিরে আসতে পেরেছি।
আর আমি সারা বিশ্বের মাঝে কোথাও হারিয়ে যাবাে না! মা, তােমার
বাবা গেলে হয়তাে আর ফিরে আসতাে না।
-একটু হাসিয়া কহিল ফাতেমা আমার বাবাই তাে ফিরে এসেছে! চল,
এখন আমার বাবা খাবে, দুলি খাবার নিয়ে আয়তাে মা।
:-দুলি পাসের ঘরে ছিলাে, কহিল- আসি খালা।
:-সাজু কহিল- দুলি অবার কখন আসলাে মা?
:-এই তাে তুই কোথায় যেন গেলি তার পর এসেছে, আমি দুলির কাছে।
খবর পাঠিয়ে ছিলাম, তায় ও খবর পেয়ে তােকে দেখতে এসেছে, দুলি,
দুলি তাড়াতাড়ি আমার কছে আয়।
:-দুলি তাড়াতাড়ি আসিয়া কহিল- সাজু ভাই তুমি কেমন আছ?
:-আরে আমি ভালই আছি, বল তুই কেমন আছিস?
:-হাসিয়া দুলি কহিল- আমি ভালই আছি, আমরা তাে ভাবতাম সাজু
ভাই আমাদের ভুলেই যাবে, ওখানে বিয়ে করবে, আর বাংলাদেশের।
কথা মনেই থাকবে না।
:-সাজু হাসিয়া কহিল-আরে না- না, তােদের ভুলে আমি কোথাও কি
থাকতে পারি? জন্ম ভুমির মায়া মমতা কেহই ভুলতে পারে না, আমিও
তেমনি পারিনি, আমি যে দিন জার্মানের পথে রওনা দিলাম, সে দিন।
তােকে দেখে গিয়েছিলাম ছােট্ট খুকি, আর আজ সেই তুই কত বড় হয়ে।
পড়েছিস, আমি তাে ভাবতেই পারিনি।
:-তুই যাবার পর দুলি আমার কাছেই ছিলাে ছয়টা বছর, দুলিকে আমার
কাছে রেখেছিলাম, দুলি আজ তাই এস.এস.সি পাস করেছে, দুলিও
বলে আমি ডক্টরী পড়ব, ভায়ের মত বিদেশ যাব।
:-মায়ের কথা শুনিয়া সাজু বড়ই খুশি হইয়া কহিল, খুব ভালাে, খুব
ভালাে, দুলি আমি তােকে ডক্টরী পড়াব, তােকে আমি আমেরিকায়।
পাঠাবার ব্যাবস্থা করবাে। ভাই বােন মিলে আমরা মানুষের সেবা করব।
:- দুলি হাঁসিয়া কহিল- না ভাই আমেরিকায় যাবার ভাগ্য আমার নাই।
শ্যামলী-০৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
যদি আল্লাহ পাক কপালে লিখে থাকে তবে ডক্টরী আমি বাংলাদেশে
পড়ব।
:-দুলির মুখের কথা কাড়িয়া নিলাে সাজু, কহিল- আচ্ছা তােকে।
আমি ডক্টরী পড়াতে পারলে, আমিও বড় খুশি হবাে!
:-ভায়ের কথা শুনিয়া দুলি বড়ই আনন্দ পেলাে, তার পর হাসি ভরা
ঠোটে কহিল দুলি- আমাদের গল্প শুনে খালা খাওয়া বন্ধ করে
দিয়েছে।
- তােদের কথা শুনে আজ আমার অনেক দিন আগের কথা মনে
পড়ে গেলাে, অনেক দিন আগের কথা শুনতে ভালই লাগবে।
-কথা গুলাে আমাদের শুনাবে? আমার শুনতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে!
-কথা গুলাে তােদের আজ সব শুনাব, এক দিন তাের খালু বলে
ছিলাে সাজুকে চিকিৎসার ডক্টরী শিখাবে, বাস্তবে তা আজ তাের
খালুর কথা পূরণ হয়েছে, খােদার রহমত ছিলাে, আর সাহায্য ছিলাে।
শ্যামলীর। আমার কোন ক্ষমতা ছিলাে না, যে পরিমান অর্থ ব্যায়।
করেছে শ্যামলী, এত অর্থ আমার যােগান দেওয়ার সামর্থ ছিল না।
শ্যামলীর চেষ্টায় আজ সাজু ডক্টর হয়েছে, শ্যামলীর দান আমরা।
কোন দিন শােধ করতে পাররাে না। এখন শ্যামলীকে আমরা
কোথায় আসন দেবাে, তােরা বলে দিতে
পারবি-----
একটু চুপ থাকিয়া দুলি কহিল- পারব খালা! আমি বলে দিতে
পারবাে, কিন্তু এখন নয়, অন্য সময় বলবাে, যখন ভাই আমাদের
কাছে থাকবে না।
:- সাজু কহিল- তাের এখনী বলতেই হবে?
:- না, আমি বলব না।
:- আমি বলছি তােকে বলতেই হবে?
:- আমিও বলছি এখনই বলবাে না।
:- ফাতেমা তাড়াতাড়ি দুলির মুখের কথা কাড়িয়া কহিল- তােরা কি
সব লাগালী থামবী নাকি।
:- সাজু ভায়ের কথায় আমি কিছুতেই থামব না। আমার গােপন
কথা
শ্যামলী-০৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ভাইকে শুনাবাে কেন।
:- ও এটা, তবেরে তাের গােপন কথা ঠিক আছে, আমার ও কিছু।
গােপন কথা আছে, আমিও তােকে কোন দিনই শােনাবাে না।
:- তােরা আবার কি গন্ডগােল বাধিয়ে দিলি ।
-খালা এটা আমাদের গন্ডগােল নয়, এটা আমাদের হার জিতের
তর্ক, দেখা যাক তর্ক করে কে হারে আর কে জেতে।
:-এ তর্কে আমি হেরে যাব, দুলি আমি হেরে যাব, দেখবী অবশেষে।
তুই জিতে যাবি, কহিল সাজু।
:- দুলি কহিল- খালা, ভাই হেরে যাবার পথে, তুমি দেখ আমিই
জিতে যাবাে।।
:- একটু নিরব থাকিয়া সাজু কহিল- এখন আমার হেরে যাবার পালা,
জিতবার পালা আমার নাই, সৰ কথা থাক, কত দিন মায়ের সামনে।
বসে।
খাওয়া হয়নী আজ আমরা সবাই মিলে এক সঙ্গে খাব, এক সঙ্গে হাসি।
খুশির মধ্যে দিন গুলাে চলে গেলে এই হবে আমার পরম শান্তি। আর
কোন কিছুর দরকার মনে করি না। মা তুমি খাও--------- | দুলি তুই
খা, আমি তুলে দিচ্ছি-----------
:- তাড়া তাড়ি দুলি, সাজুর হাত হতে চামস কাড়িয়া লইল ও কহিল-
আমি তুলে তুলে খাওয়াইব, আর তােমরা বসে বসে খাবে।
:- ফাতেমা কহিল- তােরা একি ঝামেলা করতে লাগলী আমি তােদের
হাতে তুলে দিচ্ছি, তােরাই খাবি, আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব, আর
তােরা কিনা-------
:- খালা তুমি চুপ করে বসে থাকো, আমি কি করি এক বার ছােট্ট
খুকির মত বসে বসে দেখ।
:- আমি সবিই দেখছি তাে, কিন্তু তােরা কিছুই দেখবী না।
:- খালা তুমি আমাদের অনেক কিছু দেখিয়েছ, আজ হতে তুমি দেখ
আমরা কি করি।
:- তােরা যা ভালাে মনে করিস তাই কর, রাত অনেক হয়েছে, তােরা
শ্যামলী-০৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আর কথা বাড়াবাড়ি না করে, ঘুমা গিয়ে আর কোন তর্ক নাই, তর্কের।
পথ বহু দুর, তর্ক না করা বড়দের আদেশ। আর কোন কথা না বলিয়া
নিজ নিজ ঘরে চলিয়া গেল।
*****************************************
:- রাত নিঝুম, গায়ের সবাই হয়তাে ঘুমিয়ে পড়েছে, শ্যামলী শুধু বার।
বার মনে করছে- সাজু ফিরে গেলাে! ভাের বেলা অবােধকে পাঠাব,
এখন সাজু ডক্টর হয়েছে, আমার শরীর খারাপের কথা বলব, শুনলে
ঠিকই আসবে, যদি নাই আসে তবে আমি নিজেই যাবাে, দুই কিলাে
মিটার পথ হেটে হেটেই যেতে পারব, সাজুর মা আমার বড়ই ভালাে
বাসে, ‘মা’ মারা গেলে, সাজুর মা আমার সান্তনা দিতাে সর্বক্ষণ, মাঝে।
মাঝে আসতাে, আর আমার ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে, আমার চোখের জল
মুছে দিতাে, আমার মা যদি বেচেঁ থাকত, তবে এমনি করেই ভালাে।
বাসতাে, যখন আমার বয়স পাচ বছর, তখন মা মারা গেছে! এক দিন।
আব্বাকেও হারালাম! আজ আমার বলতে আর কেউই নেই! নিঃসঙ্গ
জীবন! আব্বা শহরের নামজাদা উকিল ছিলাে, বড় আশা ছিলাে, আমার
আইন শিক্ষা দেবেন, কিন্তু সেই আশা পূরণ হবার আগেই বিশাল এই
পৃথিবীর বুক হতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেলাে! চির দিনের মত
আমার আপন বলতে দ্বিতীয় আর কেহই রইল না! ঠিক তখনই সাজুর
মা আমার পাসে এসে দাঁড়াই ও সান্তনা দিতাে, আর বােঝাতাে।।
:- কাদে না মা, দুনিয়াতে কেউ সারা জীবন বেচেঁ থাকতে আসেনী!
পৃথিবীতে সারা জীবন থাকবার জায়গা নাই। এই জগত হতে একে
একে সবাইকে ছেড়ে যেতে হয়। পরকাল যে চির সুখের জায়গাঅনন্তকাল
থাকতে হবে সে পাওে, দুনিয়ার খেলা তার শেষ। তুমি আমি।
আমরা সবাই চলে যাব একদিন, এই দুনিয়া শুধু মাত্র দু-দিনের খেলা
ঘর।
:- শ্যামলী- এমনি করে দিনের পর দিন আসিয়া, খালা আমার সান্তনা
দিত, কিছুতেই আমার মনকে সান্তনা দিতে পারতাম না, সাজুর মা
শ্যামলী-১০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আমার বড় ভালাে বাসে, এখনও মাঝে মাঝে আসে আর শুধু একটা
কথায় বলে।
- তােমার আব্বা বড় ভালাে মানুষ ছিল, সাজুর আব্বা যে দিন মারা
গেলাে, সেই দিন হতে আমাদের দেখা সােনার ভার নিল, বলতাে
সাজুকে লেখা পড়া শেখাতে হবে। তােমার আব্বা আমাদের জন্য যা
কিছু করে গেছে, এ পৃথিবীর কোন মানুষ আমাদের জন্য তা কেউই।
করেনি! সত্যি কথা বলতে কি জান-------, আমার ঠিক বােনের মত
করে ভালাে বাসতাে, এমনি করেই দিন গুনতে গুনতে এতটা পথ।
আসতে পেরেছিলাম! একদিন তােমার আব্বা মারা গেলাে, তার পর
আগের সেই দিন গুলাের কথা আরাে অন্তরে একে একে এসে ভিড়।
জমতে লাগলাে, আজো মনে পড়ে, আর ভাবতে পারি না, আগের সেই
দিন গুলাের কথা! সবাই, ওরা সবাই তাে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে,
সুখের এক ঘরে। চির সুখের ঐ ঘরে একে একে সবাইকে চলে যেতে
হবে। কাঁদে না মা, তােমরা থাকবে, আমার ও যেতে হবে! দোয়া করি
তােমরা সুখে থাকবে, পূর্ণ হােক তােমাদের আশা, শ্যামলী তুমি থাক।
মা, আমি আবার এসে দেখে যাব....
:- শ্যামলী-তুমি আমার সামনে আসলে মায়ের মমতা তােমার ভিতরে
পাই, আবার এসে দেখে যাবে কিন্তু, তুমি ছাড়া আমার আর কেহই।
শান্তনা দিতে আসে না! তুমি আমার মায়ের মত। তুমি পাশে থাকলে
আমি বড় শান্তি পায়। এমনি করেই চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে
পড়েছিল শ্যামলী।
*****************************************
:- ভাের হয়ে পড়েছে, পাখির কলরবে সাজুর ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলাে।
তাড়াতাড়ি উঠিয়া মায়ের জাগিয়া দিয়া সাজু কহিল-মা আমি ঢাকায়।
যাব, তােমাকে তাে বলাই হয়নী। বলব মনে করেছিলাম কিন্তু আর
খেয়াল ছিলাে না। ফিরতে কিছু দিন দেরি হয়ে যাবে।
:- সাজুর মুখের কথা কাড়িয়া কহিল ফাতেমা- কত দিন পর বাড়ী
আসলী কিন্তু এক দিনও বাড়ী থাকলী না। আজ ঢাকায়, কাল ওখানে,
শ্যামলী-১১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
পরসু বন্ধুর বাড়ী, মায়ের মন যে কি বলে, তা এক দিনও ভেবে দেখলী।
! তাের ছেলে যে দিন এমনি করে বেড়াবে সে দিন সব বুঝবি, তা কবে
ফিরবী বল?
:- মা এবার গেলে খুব তাড়া তাড়ি ফিরতে পারবাে। এক সপ্তাহ সময়।
লাগবে তার বেশী নাই।
:- এক সপ্তাহ কি কম সময় হলাে?
:- মা এক সপ্তাহ সময় মাত্র সাত দিন, এমন কি আর বেশী দিন হলাে?
একটা কথা মনে রেখাে মা, আমার সন্তানের কথা বলছ? আমার ছেলে।
মেয়েদের কোথাও যেতে দেব না, তােমার মত চিন্তা আমি করব।
না..............।
:-কয় দিন আর বা বাঁচব, তােদের যেটা ভালাে হয় তাই করবী, আমি
যেমনটা করে গেলাম।
:-মা, দুলীর ডাক দাও, দেখাটা করে না গেলে আমার উপর আবার
ভিশন রাগ করবে, তখন আর থামান যাবে না, আজ-কাল কথা
শিখেছে।
:- ফাতেমা দুলিকে ডাকিয়া দিয়া নিজে রান্নার কাজে গেলাে, একটু পরে
দুলি আসিয়া ফাতেমার কাজের সাহায্য করিতে লাগিলাে। তাড়াতাড়ি
রান্না শেষ করিয়া, দুলি ডাকিয়া কহিল সাজুকে- সাজু ভাই টেবিলে
খাবার রেখেছি। সাজু খাবার টেবিলে বসিয়া ভাত খাইতে খাইতে।
কহিল-এবার রমজান মাসে তােকে এখানে থাকতে হবে, পারবি তাে?
:- তুমি যদি বলাে তবে নিশ্চয় থাকবাে।
:- এমনি সময় ফাতেমা আসিয়া কহিল- সাজু আমিও তােকে বলছি।
রমজানের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কোথাও থাকতে পারবি না।
:- একটু ভাবিয়া কহিল সাজু- মা, এবার রমজান মাসে বাড়ীতে থাকব।
হয়তাে আর কোথাও যাব না, আমার নিজের জন্য একটা পরিক্ষা আছে।
দুলিকে ডাকিয়া বলিল, সূর্য উঠতে আর সামান্য দেরী,
শ্যামলী-১২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
সূর্য উঠার পর পরই ঢাকার গাড়ী এসে পড়বে, দেরি হয়ে গেলে আজ।
আর যাওয়া হবে না।
- দুলি বলিল- আমি তাে সব কিছু সামনে হাজির করেছি, তােমার
খাওয়া শেষ হতে হতে যা কিছু লাগে, সব ব্যাগের ভিতরে রাখছি, কিছু।
ভুল করব না।
:- সাজু বলিল- দুলি দেখছি কাজ গুলাে সব গুছিয়ে দিয়েছে।
:- ভাবী আসলে তখন আর আমাদের দরকারই হবে না।
:- আরে দুলি, দেখছি কথাও শিখেছিস বেশ ভালাে।
:- সাজুর খাওয়া শেষ হয়ে গেলাে ও দিকে দুলিও সব কিছু গুছিয়ে।
দিলাে, সব কিছু দেখিয়া লইল সাজু, মা, আমার জন্য দোয়া করাে!
দুলিও দোয়া করাে!
- ফাতেমা বলিল- আল্লাহ তােমার উপর রহমত করুক, আমার দোয়া
নিয়ে, সুখে থেকো।
:- যাবার সময় সাজু কহিল- মা তুমি কোন চিন্তা করনা, তােমার দোয়া
পেলে আমি ঠিক সময় মত আসতে পারবাে, মায়ের দোয়া নিয়ে সাজু।
ঢাকার পথে চলিয়া গেল।
:-ফাতেমা মনে মনে কহিতে লাগিল, গত জীবনের কথাই মনে পড়িয়া।
গেলাে, সাজুর আব্বা মারা যাবার পর কিভাবে দিন গুলাে অতিবাহিত
হলাে, কত কষ্টে দিনগুলাে চলিয়া গেলাে, কোন দিন এক মুঠা ভাত পেটে
দিয়ে ছিলাে, আবার কোন দিন শুধু মাত্র পানি খেয়ে দিন কাটিয়ে ছিলাে,
এমনি করেই সুখ দুঃখের মাঝ দিয়ে আজ এই পর্যন্ত-----
সাজু চাকরী পেলে দু-পয়সা রােজগার করবে, তখন দু-বেলা দু-মুঠো
ভাত খাবে এমনি করেই, নানা চিন্তা মনের ভিতরে ভিড় জমাতে লাগল।
-এমনি সময় হাপাতে হাপাতে অবােধ আসিয়া কহিল-ফুফু, শ্যামলী
বুবুর খুব শরীর খারাপ, তায় শ্যামলী বুবু আমার পাঠালাে সাজু ভায়ের
সঙ্গে করে নিয়ে যেতে, তাই ভাের বেলা উঠেই চলে এসেছি, সাজু ভাই
কোথায়? এখনী আমার সঙ্গে যেতে হবে, না গেলেই নাই।
শ্যামলী-১৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-ফাতেমা অশ্রু মুছিয়া কহিল- সাজু, সে যে এই মাত্র ঢাকায় চলিয়া
গেলাে, আজ তাে তার পাওয়া যাবে না।
:-অবােধ আস্তে আস্তে কহিল- ফুফু তুমি কাদছ?
:-চোখের জল মুছিয়া ফাতেমা কহিল- না না আমি কাঁদব কেন!
আমার চোখে প্রায় পানি এমনি করে ঝরে।
:-অবােধ অস্থির হয়ে আবার কহিল- সাজু ভাই ঢাকায় চলে গেছে!
কিন্তু শ্যামলী বুবু যে আমার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছে, আমি
। শ্যামলী বুবুর কাছে কি বলব? বুবুর গায়ে যে ভিশন জ্বর ফুফু!
:- কিছুক্ষন চুপ থাকিয়া অবােধকে ফাতেমা কহিল- অবােধ তুই এক।
কাজ কর। শরৎ বাবুকে ডেকে নিয়ে যা, আমি এখনী চলে আসছি, যা
আর দেরি করিস না।
:- আমি তা হলে শরৎ বাবুকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছি, ফুফু তুমি খুব।
তাড়াতাড়ী এসাে আমি চলি, অবােধ ছুটলাে ডক্টর শরৎ বাবুর বাড়ী।
:-ফাতেমা, দুলিকে ডাকিয়া কহিল- দুলি, তুমি বাড়ীতে থাক, আমি
শ্যামলীর সঙ্গে দেখা করে আশি, খবর যখন পেলাম, না গেলে কি হয়,
মা মরা মেয়ে বাবার কাছে বড় আদরের ছিল, দুনিয়াতে তার আর
কেহই নাই এখন কে তার দেখা শুনা করবে, আজকের এই বিপদের
দিনে, কে তার সেবা যত্ন করবে, আমি আর দেরি করবাে না যায়,
বলিয়া চলিয়া গেলাে ফাতেমা।
:-দুলি পিছনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলিল- খালা চলে গেলাে, আজ
ফিরে আসবে কি না, তাও বলে গেল না। আমি গেলেও দেখে আসতে
পারতাম, কখন যে ফিরবে তাও বলে গেল না।
*****************************************
:-আজ শ্যামলীর ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে তবুও
ফজরের নামাজ আদায় করতে পেরেছে, প্রতিদিনের মত ফজরের
নামাজ পড়িয়া, আজও মাতা-পিতার জন্য দোয়া করিতে ছিলাে,
মােনাজাত শেষ করিয়া লইল।
:-এমনি সময় পিতি আসিয়া কহিল- বুবু, তােমার টেবিলে খাবার
শ্যামলী-১৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
রইলাে, আজ নাকি ঢাকায় যাবে?
- শ্যামলী অশ্রু ঝরা নয়ন দিয়ে একবার ফিরিয়া তাকাইল কোন কথা
কহিতে পারিল না শ্যামলী। ?
:- একটু ধীর কণ্ঠে পিতি কহিল- বুবু সারা জীবন কি এমনি করে।
চোখের পানি ঝরাবে ?
:- উত্তরে শ্যামলী বলিল- আমার চোখে কেন যে পানি আসে তােকে।
কেমন করে বােঝাব বল? আমার ভিতরে যে কি আগুন জ্বলছে, তা
তােকে বুঝাতে পারবাে না, তায় অশ্রু ঝরা ঠেকাতে পারি না, উভয়ে।
কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া আবার শ্যামলী বলিল- অবােধ কি ঘুম থেকে
উঠেছে?
:- উনি তাে ডক্টর সাজু ভায়ের ডাকতে গিয়েছে।
- ও, তবে তুই চা নিয়ে আয়, প্রতি দিন সকালে অবােধকে ডাকতে
হয়, আজ আর ডাকতে হয়নী, এত ভাের বেলা কোন দিন উঠতে দেখি
না। :- তােমার শরীর ভালাে নাই শুনে আজ সারা রাত ওর ঘুম হয়নী, সেই
মােরগ বাগ দিয়েছে ঠিক তখনী তার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে, তার পর সাজু।
ভায়ের ডাকতে গিয়েছে সেই ভাের বেলা, কিন্তু এতক্ষন ফিরে আশার।
কথা, আসছে না কেন? আমার কাছে বলে গেলাে যাব আর আসব,
এমন সময় ফাতেমা আসিয়া পড়িল।
:-শ্যামলী কহিল- খালা, তুমি কেমন আছ? এখানে বস ফাতেমা বসিল।
, কোন কথার উত্তর দিলনা।
:-ফাতেমা মাথায় কপালে হাত রাখিয়া কহিলশ্যামলী এখন কেমন।
লাগছে, শরীর ভালাে নাই বুঝি?
:- একটু কি যেন চিন্তা করিয়া, শ্যামলী কহিল- আমি এখন ভালই
আছি, রাতে খুব খারাপ লাগছিল।
:- ফাতেমা শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে কহিল অবােধ গিয়েছিলাে।
সেই সকাল বেলা, তােমার শরীর ভালাে নাই শুনে আমি আবার
অবােধকে পাঠালাম, শরৎ বাবুর কাছে, ডক্টর শরৎ আসেনী?
শ্যামলী-১৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-শ্যামলী যেন, লজ্জিত হচ্ছিল, তবুও বলতে বাধ্য হলাে- না শরৎ বাবু।
এখনও আসেনী।
:-ফাতেমার অনেক কথা মনে পড়িয়া গেল, কহিল- তােমার শরীর
ভালাে নাই শুনে আমি আর বিন্দু মাত্র দেরি করিনি, অবােধ মনে হয়।
শরৎ বাবুকে সঙ্গে নিয়ে আসছে, এত চিন্তা করলে কি আর শরীর ভালাে
থাকে, আজ যদি তােমার মা-বাবা বেঁচে থাকতাে তবে এত বড় ভার।
মাথায় এসে পড়তাে না, কপালে যা আছে তাই হবে মা---
:-পিতি চা নিয়ে আসিয়া, ফাতেমার হাতে ও শ্যামলীর হাতে দিলাে,
আর একটা করিয়া রুটি দিয়া কহিল- বুবু, আমি অন্য কাজে গেলাম
বলিয়া পিতি চলিয়া গেলাে।
:-শ্যামলী বলিল- খালা, সাজু ভাই কেমন আছে?
-ফাতেমা একটু চিন্তিত হইয়া বলিল- ভালই আছে।
:-শ্যামলী বলিল- জার্মান থেকে সাজু ভাই ফিরে আসলাে কিন্তু আমার
সঙ্গে এক বারও দেখাটা পর্যন্ত করে গেলাে না! সেই ছয় বছর আগে
সাজু ভায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে ছিলাে। মনে হচ্ছে আমি কত দিন
যেন দেখিনী, জান্তে পেরেছি বাড়ী এসেছে-----
:-ফাতেমা বলিল- জার্মান থেকে ফিরে এসে কোথায় থাকে কি যে
করে, সাজুই জানে আজ কয় দিন হলাে এসেছে, তার বন্ধুদের সঙ্গে
দেখা করে বেড়াচ্ছে, আজ আবার ভাের বেলা ঢাকায় গেলাে। অবােধ
হাজির হবার কিছুক্ষন আগে আমি অবােধকে জিজ্ঞাসা করলাম- অবােধ
এত সকালে কি মনে করে আসলে? অবােধ আমার শুনালাে শ্যামলী
বুবুর খুব জ্বর।
:-অবােধ প্রবেশ করিয়া তায় বুবুকে কহিল- সাজু ভাই ঢাকায় চলে
গেছে, ফুফু বললাে আমার, তুই যা শরৎ বাবুকে আমি সঙ্গে নিয়ে
আসছি।।
:- শরৎ বাবু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া কহিল- মায়ের জ্বর কবে।
থেকে গাে? শ্যামলী লজ্জিত হইয়া কোন কথা বলিতে পারিল না।।
শ্যামলী-১৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- আবারও কহিল ডঃ বাবু- ছেলের কাছে মায়ের লজ্জা কিসের গাে?
আমি যে তােমার ছােট্ট ছেলে গাে!
:- ফাতেমা একটি চেয়ার দিলাে ডক্টর বাবুকে বসতে।
:-ডক্টর বাবু বলিল, বসবাে বৌদি বসবাে, মায়ের আদেশ না পেলে কি
ছেলে বসতে পারে? জ্বর পরিক্ষা করার জন্য থারমােমিটার লাগাইল
কিছুক্ষণ পর উত্তর আসিল, কহিল ডক্টর বাবু না কোন অসুবিধার কারণ
নেই। বিভিন্ন চিন্তায় শরীর ভেঙ্গে পড়েছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
:-শ্যামলী নিজেই জানে তার কোন জ্বর নেই, ছােট বেলা থেকে
সাজুকে ভালােবাসে, অনেক দিন না দেখায় তার হৃদয় অস্থির হয়ে।
উঠেছে, লজ্জায় নিজেকে সামলালাে।
:-কিছুক্ষণ সবাই নিরব রইল, তার পর ডক্টর বাবু বলিল- এত বড়
সংসারের গুরু ভার সবই তােমার মাথার উপর, চিন্তা তাে হতেই
পারে। এই চিন্তা যারা করবে তারা পরপারে চলে গেছে, আমি
আশির্বাদ করি ওরা যেন স্বর্গ বাসি হতে পাওে, কতইনা ভালাে মানুষ।
ছিলাে তােমার মা-বাবা, ওরা যখন বেঁচে ছিলেন তখন কত এসেছি,
তােমার মায়ের হাতে খেয়েছি, আমাদের মাঝে হিন্দু মুসলিমের ছিল না
কোন ভেদাভেদ। এমনি করেই আমরা মিলেমিশে বসবাস করেছি এই
গায়ে, আমাদের সময়ে একে অপরের সাথে এমনি করেই ভালােবাসা।
ছিলাে।
:-বিন্দু বিন্দু অশ্রু চোখে, ফাতেমা কহিল- সে দিনের কথা আর।
আজকের দিনের কথা যখন মনে পড়ে যায়। তখনকার মানুষের কথা।
মনে পড়ে, সেই সব মানুষের মনে কত না ছিল ভালােবাসা। সেই
ভালােবাসা, সেই ভালােবাসা এখন আর নেই কাহারও মনে। অভাবি
মানুষরা অন্যের সাহায্য পেয়েছে, এখনকার মানুষেরা কারাে পানে।
ফিরে চাইনা, আগের কথা আজকের দিনে বলে আর কোন লাভ নেই!
ওসব কথা থাক, ডক্টর বাবু মেয়েটার কোন জ্বর নেই তাে?
:- না, না কোন জ্বর নেই, নানান চিন্তায় এমন হয়ে পড়েছে, আস্তে
আস্তে সব ভালাে হয়ে যাবে চিন্তার বিষয় নাই।
শ্যামলী-১৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- ভালাে হয়ে যায় সেই ভালাে, আমি বড় চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
আজ মামুন ভাই যদি বেঁচে থাকত তবে শ্যামলীর মাথায় এত বড় ভাড়
পড়ত না।
:- ঠিক বলেছ বৌদি, মামুন ভাইয়ের কথা চিন্তা করতে গেলে বিশ বছর।
আগের কথা চিন্তা করতে হয়।
:- হ্যা বিশ বছর আগে শ্যামলীর মা মারা গিয়েছিল, অন্য কেহ হলে আর।
একটি বিয়ে করে ফেলতাে, কিন্তু সে কাজ মামুন ভাই করেননি, এক
দিনের কথা মনে পড়ে যায়, তখন সাজুর অব্বা বেঁচে ছিলাে এবং
বলেছিলাে, মামুন তুই আর একটা বিয়ে কর।
:-মামুন ভাই তার জবাব দিয়েছিলাে- করিম তুই একবার ভেবে দেখলি।
না? বিয়ে তাে এক বারই হয়, দ্বিতীয় বিয়ে করা ভুল, ঐ ভুল পথে আমি
আর যাব না, কথাটা মনে রাখিস, আর একটা মেয়েকে বিয়ে করলাম,
যদি ঐ মেয়েটাও মারা যায়, তবে আমার আবার বিয়ে করতে হবে
নাকি? নিঃসঙ্গ জীবনটা এখন আমার কাছে ভালাে, অনেক অনেক
ভালাে।
:-হাসতে হাসতে ফাতেমা কহিল- কে কখন মরবে কে জানে, তবুও
মামুন ভায়ের বিয়ে করাই ভালাে।
:-মামুন- আরে ফাতেমা তােমার মুখে ঐ কথা? আমি তাে ভেবেছিলাম।
ফাতেমা আমার পক্ষে থাকবে, কিন্তু আমার পক্ষে কেউ কথা বলে না,
সবাই বলে বিয়ে কর, বিয়ে কর। আমি আবার যদি বিয়ে করি তবে যে।
শ্যামলীর হত্যা করা হবে, এ আমি কিছুতেই পারব না।
:-করিম কিছুক্ষণ নিরব থাকিয়া আবার কহিল- আমি তাে সবই বুঝি,
তাের বয়স এই মাত্র ত্রিশ, কিন্তু নিঃসঙ্গ হয়ে আগামি দিন গুলাে কেমন।
করে কাটাবি? আমি ভালাে না বুঝলেও কিছু তাে বুঝি।
:-মামুন গভীর ভাবে চিন্তা করিয়া আবার কহিল- ছেলে মানুষ আমি এত
দিন ছিলাম, কিন্তু আমার মাঝে আর আগের মত মন নেই। দুনিয়ার
সমস্ত সুখের আশা ভুলে গেছি, একবার ভুল করিলে ভুলের মাসুল কেউ
আর দিতে পারে না।
শ্যামলী-১৮ পৃষ্ঠা ১৫৬
শ্যামলী-০৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-করিম দংখ করিয়া বলিল- আমি জানি বিয়ে না করে তুই থাকতে
পারবি না বিয়ে তােকে এক দিন করতেই হবে, এমনি করে নিঃসঙ্গ
ভাবে জীবন যাপন করা যায় না, আমার জানা শুনা একটা মেয়ে।
বলছে। তাকে বিয়ে করলে তুই আবার সুখি হতে পারবি, আর কোন।
অমােত করিস না মামুন।
:-মামুন চোখের অশ্রু মুছিয়া, হাঁসি মুখে কহিল- আমি তােকে বেশি
ভালাে বাসি, তার চেয়ে বেশি ভাল বাসি তাের স্ত্রীকে, বােন হিসাবে।
আমি শত দুঃখের মাঝে থাকলেও তােদের কাছে আসি আমার এই
কালাে মুখে হাসি
ফুটাতে। এর পরও যদি তােদের মনের কথা আমার সামনে এমনি।
করে বলিস, দুঃখ পাব কি হাসি পাব, হিসাব করে বল? যেখানে যে
হাসি পায়, সে সেখানেই যায়, দুঃখ যেখানেই পায় সেখানে কেউ যায়।
না। ফাতেমা তুই বল আমার হাঁসাবি না কাঁদাবি।
-------------------?
-তুমি বেঁচে থাকলে আমার শ্যামলী বেঁচে যাবে, তার পর আমরা তিন
জন অনেক সময় নিরব রইলাম, ঐ কথা গুলাে আমার আজও মনে
পড়ে, শরৎ বাবু মাথা তুলিয়া বলিল- এমন মানুষের কথা চিরকাল
মনে থাকবে, এই দুনিয়ায় ওরাই তাে মানুষ! আমি ওদের জন্য
আর্শিবাদ করি, ওরা সর্গ বাসি হােক, ওরা সর্গ বাসি হােক।
:-শরৎ বাবু কোন রােগ খুজিয়া পাইল না, শ্যামলীর ঔষধ না দিয়া।
চলিয়া যায়বার আগে বলিল- শ্যামলী, কোন চিন্তা করাে না মা,
আমারও ছােট্ট বেলায় মা মারা গিয়েছিলাে, বাবাকে তাে চোখেও।
দেখিনী কোন দিন, আমি মায়ের কাছে মানুষ হয়ে আজ বুড়াে হয়ে।
গেছি। দেখবে তুমি একদিন আমার মত বুড়াে হবে, আমিও এ বিশাল।
পৃথিবী হতে চির বিদায় নিয়ে চলে যাব! একে একে সবাইকে চলে।
যেতে হবে, কেহ আগে আর কেহ পরে, আমি চলি বলিয়া। প্রস্থান।
করিল শরৎ বাবু।
:- কথা গুলাে শুনিয়া নিরবে বসিয়া রইলাে শ্যামলী, নানা চিন্তা এসে
শ্যামলী-১৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ভিড় জমিয়েছে কোন কথা না বলিয়া চুপ করিয়া আছে।
:- ফাতেমা একটু চুপ থাকিয়া কহিল- শ্যামলী, এখন তােমার কেমন
লগছে?
:-শ্যামলী কাদ কাদ স্বরে বলিল- ফুফু, থেকে থকে মনটা বড় খারাপ
হয়ে যায়। এত বড় জমি-দারি, আজ আমার মাথায় এসে চাপলাে! আমি
আর পারিনা, মন বলে কোথাও নিরিবিলী জায়গায় চলে যায়, জমিদারির
বােঝা বড় ভারি লাগে, এই মনে আর কিছুই ভালাে লাগে না, শ্যামলীর
মুখের কথা কাড়িয়া নিয়া কহিল ফাতেমা- না মা, পাগলামী করিস না।
:-কোথায় যাবি বল? তা ছাড়া এই বােঝা কে বহন করবে? আস্তে
আস্তে সব ভালাে হয়ে যাবে, বিধাতা যা কিছু করে তা ভালাের জন্যেই করে,
আমরা ভেবে কিছুই করতে পারবাে না, খাবার নিয়ে প্রবেশ করলাে
পিতি।
:-শ্যামলী কহিল- এখনকার তরকারি কি?:-পিতি কহিল- এখন মাংস।
আর ডাল। :-শ্যামলী ফাতেমার হাত ধরিয়া খাবার টেবিলে নিয়া গেলাে- কহিল।
ফুফু তুমি খাও এক সঙ্গে খেলে আমি বড়ই খুশি হবাে, একই টেবিলে
বসিয়া খাওয়া শেষ করিয়া লইল।।
:- কিছুক্ষণ পর ফাতেমা বলিল- শ্যামলী?
:- শ্যামলী ছােট্ট করিয়া উত্তর নিল- হ্যা।
:-ফাতেমা, দুই হাত ধরিয়া কহিল- আমি আজ যাই মা, আবার
আসবাে, সাজু ঢাকা হতে বাড়ী আসলে দেখা করে যেতে বলব।
:-শ্যামলী হাসি মুখে কহিল- সাজু ভায়ের কত দিন দেখিনি, ঢাকা থেকে
ফিরে আসলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও, আর যদি নাই আসে তবে
আমি নিজেই দেখে আসবাে।
:-ফাতেমা যেন লজ্জিত হলাে, তবুও হাঁসি মুখে কহিল- তােকে আর
যেতে হবে না, দেখবী সাজু নিজেই আসবে, আমি আজ চলি মা, বালয়।
ফাতেমা চলিয়া গেল।
শ্যামলী-২০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-শ্যামলীর একটাই চিন্তা শুধু সাজুকে নিয়ে, মনের মাঝে তােলপাড়
করিতেছে, ভাবনা তার একটাই, দুর দেশে গিয়ে কি আমার ভুলেই
গিয়েছে, নাকি আমার কথা মনে আছে তার হৃদয়ে! যদি আমায়।
ভালােবাসতাে, তবে নিশ্চয় আমার একবার চোখে দেখে যেতাে, দেশে।
ফিরে আমার সঙ্গে দেখা না করে, তার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমি
কি তার কিছুই ছিলাম না! আমার কাছে কি একবার আসতে তার মন।
চাইল না, আমি তাে তার কাছে কোন অপরাধ করিনী, কিন্তু আমার কাছে।
আসতে তার বাধা কিসের, ছােট্ট বেলার খেলার সাথী ছিলাম, সে কথাও
কি ভুলে গিয়েছে? আজ যদি কাছে পেতাম, বসিয়ে নাবলা কথা গুলাে সব
বলতাম, আমার হৃদয়ের আসনে সাজু ছাড়া যে আর কেউ নেই! এ জনমে
সাজু ছাড়া আর কেহই আমার মনের আসনে বসতে পারবে না, এই মন।
যে সাজুকে চির কালের জন্য কাছে পেতে চায়।
:-এমনি সময় অবােধ প্রবেশ করিয়া বলিল- বুবু জান এক জন লােক
তােমার ডাকছে বাহিরে।
:-চোখের জল মুছিয়া পিছনে ফিরিয়া শ্যামলী বলিল- কে ডাকছে রে?
:-আমতা আমতা করিয়া অবােধ বলিল- আমি চিনি না।
:-শ্যামলী আর কিছু জিজ্ঞাসা না করিয়া বলিল- যা, কাছারি ঘরে বসার
জায়গা করে দে, ঐ লােকটাকে বসতে বল, আমি এখনী আসছি।
:-অবােধ কথা নিয়া চলিয়া গেলাে।
:-কিছুক্ষণ পর শ্যামলী কাছারি ঘরে হাজির হলাে, কহিল- আহম্মদ ভাই
তুমি কি মনে করে?
:-আহম্মদ হাসি মুখে কহিল তােমার কাছে এসেছি বড় আশা করে। এমন
একটি জিনিস চাইব, জানি তুমি আমার ফিরিয়ে দেবে না ?
:-একটু মন স্থির করিয়া শ্যামলী কহিল- এমন কি জিনিস চাইলে আমি
দেবাে না।
-বলাে, তুমি সেই জিনিষের কথা?
:- তােমার আব্বা তাে মারা গেছে?
:- হ্যা আমার আব্বা মারা গেছে।
:- এখন তুমি সমস্ত কিছুর মালিক?
:- হ্যা বলতে পার তাই।।
শ্যামলী-২১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- তুমি এখন সব কিছুর মালিক তাই আসলাম।
:- তুমি খুব বেশি কথা বলাে, যেটা চাইতে এসেছ তার কথা বলাে, সেই
জিনিসটা কি?
:- আমি বলছিলাম তােমার ঐ শহরের বাড়ীটা যদি দিতে তবে আমি
ভাড়া করে থাকতাম।
:- তুমি আমার ঐ বাড়ী ভাড়া নিয়ে কি করবে?
:- আমি এক জন উকিল মানুষ, কোটের সামনে বাড়ী, তায় আমার খুব।
পছন্দ, বড় আশা নিয়ে এসেছি।।
:- না, বাড়ী ভাড়া দিয়া যাবে না।
:- যদি কোন দিন ভাড়া দেওয়া হয় তবে আমারই দেবে।
:- তুমি খুব বেশি কথা বলাে, সে কথা আগেই বলেছি নিশ্চয় তােমার
মনে আছে? আর কয় দিন পর আমি নিজেই চলে যাব ঐ বাড়ীতে।
:-আর কোনাে কথা না বলিয়া আহম্মেদ চলিয়া গেলাে।
*****************************************
:-প্রবেশ করিল নাসির খা, গাঁয়ের এক জন প্রবিন শিক্ষক, চাকরীর বয়স
শেষ তায় লােক জন নিয়ে চাষ কওে, আশে পাশের গ্রামের লােকেরা,
কেউ মাষ্টার বলে, কেউ চাষী বলে ডাকে।
:-নাসির খায়ের আসা দেখিয়া শ্যামলী কহিল- চাচা কতদিন আসনী,
বসাে কি মনে করে?
:-তােমার ছেলের ঘরে বসতে আসলাম মা, বেশ কিছু দিন হলাে আসতে
পারিনী, একটা কিছু মনে করেই এসেছি,
কিন্তু...................
:-চাচা কিন্তু মানে কথাটা কি?
:-এমন কিছুই নাই মা, তবুও কথাটা বলতে হবে আমার, আজ যদি না
বলি ভুলটা হয়েও যেতে পারে।
:-ভুলটা কে করতে যাচ্ছে চাচা?
:-না বুঝে ভুল তাে সবাই করে থাকে, আমি তােমার একটা কথা জানিয়ে
দিয়ে যাচ্ছি মা, আমি যা বলব তার আগে সত্য কথাটা বলবে তাে?
:-চাচা আমার মা-বাবা নেই, তােমাদের উপর ভরসা করেই তাে এই
শ্যামলী-২২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
গায়ে আছি, তােমার মেয়ের মত করে যদি না রাখ, তবে আমি এই গাঁয়ে
থাকতে পারবাে না, সত্য কথাই বলব কথাটা কি চাচা?
:-যে ছেলেটি এসেছিল তােমার কাছে কেন বলাে?
:-শহরের বাড়ী ভাড়া নেবে এই জন্য এসেছিল।
:-এই কথা যদি সত্য হয়, তবে শহরের ঐ বাড়ী কখনও আহম্মেদের
কাছে দেবে না, অনেক মানুষের ঠকিয়েছে, তােমাকেউ ঠকাতে পারে।
শহরের বাড়ীর তালা চাবি তােমার নিজের হাতে রেখে দিও, আমি বুড়াে
হয়ে গেছি মূর্খ মানুষের সমান, তবুও যত টুকু বুঝি তায় জানিয়ে দিলাম।
এখন তােমার যা ভালাে হয় তায় করতে পারাে।
:-চাচা আমি তােমার মেয়ের মত, না বুঝে যদি ভুল করতে যাই, সেটা
ভেঙ্গে দিও এই আমার দাবি রইল তােমার উপর, আর আমার কোন
দাবি নাই, শহরের বাড়ীটা যদি কিছু করতে চাই, তবে তােমার কাছে
অনুমতি নিয়ে করব তার আগে নাই।
:-শুধু আমার বুঝটা নেবে কেন মা, তােমারও তাে বুঝ আছে, কথায়
বলে নিজের বুদ্ধি মত ফকির হওয়া সেও ভালাে, অন্যের বুদ্ধিতে বাদশা
হওয়া ভালাে নাই, আজ আমি যায় মা, আবার আসবাে যতদিন বেঁচে
আছি।
:-না চাচা তা হয় না, বাড়ীর ভিতরে চলাে, কিছু মুখে দেবে তার পর এ
বেলা থাকবে অপর বেলায় যাবে, চলাে বাড়ীর ভিতরে অনেক কথা।
আছে।
:-আবার বাড়ীর ভিতরে যাব মা?
:-কত দিন পর ছেলের সঙ্গে দেখা হলাে মা হয়ে ছেলেকে কিছু মুখে।
দেবে তার পর বাড়ী যাবে, দু জনাই বাড়ীর ভিতরে গেল।
*****************************************
:-শ্যামলী, পিতিকে ডাকিয়া বলিল- আমাদের বাড়ীতে কে এসেছে এ
দিকে আই চিনতে পারবি?
:- পিতি আসিয়া দেখিল নাসির চাচা, বলিল- আরে বুবু যেন পাগল হয়ে
গেছে, এই তাে আমাদের খােকা, এবার বুবু তুমিই বলাে খােকাটি কি
বলে ডাকবে আমাদের..........
:-হাসি মুখে শ্যামলী কহিল-আমাদের কি বলে ডাকবে খােকাটিই
শ্যামলী-২৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-এক গাল হাসি মুখে নাসির খা বলিল—যে মায়ের গর্ভে ছিলাম তাকে
মা বলে ডেকেছি, গর্ভ ধারিনী মা আজ এ দুনিয়ায় নেই, এখন তােমরাই
আমার মা, সবাই হাসলাে তারপর শ্যামলী কহিল-পিতি, তুমি যাও
চাচার জন্য চিড়ে মুড়ি দুধ আর চিনি নিয়ে আসাে।
:-পিতি খাবার আনিতে চলিয়া গেল।
:-চাচা আমি এই বাগান বাড়ী হতে শহরের বাড়ী কোন দিনই যাব না।
আব্বাও শহরের বাড়ীতে থাকতাে না, আমাকে ডেকে নিয়ে বলতাে,
শ্যামলী গ্রামের বাড়ীতে আমি সব কিছু রেখে গেলাম, শহরের বাড়ীতে
কিছুই নাই, আমার মৃত্যুর পর তুমি এই গ্রামের বাড়ীতে থাকবে শহরে।
যাবে না, আব্বা আমার শহরে যেতে নিষেধ করলাে কেন?
:-শহরে তােমার আপন কেহ নাই তায় নিষেধ করে গেছে, ঐ শহরে
তােমাকে আপন করে কেউ ভালাে বাসবে না, কিন্তু এই গ্রামের মানুষ
সবাই তােমাকে আপন করে ভালাে বাসবে, তায় তােমার আব্বা শহরে
যেতে নিষেধ করে গেছে, আমিও তােমার ঐ কথায় বলবাে শহরে যেতে
দেব না, আজ তুমি শহরে গেলে এই বাগান বাড়ী মাঠের জমি কে দেখা
শােনা করবে বলাে? :-আমার যে শহরে যাবার খুবই ইচ্ছা চাচা!
:-শহরে গেলে তােমায় কেউ চিনবে না তুমি যে নারী।
:- চাচা আমি যে গ্রামেও সেই নারী?
:-এ তােমার জন্ম ভুমি এখানে নতুন করে আবার কে চিন্তে আসবে।
সবার কাছেই তাে তুমি চেনা মুখ।
:-আমি যে একা থাকতে বেশী ভালাে বাসি।
:-একা তুমি থাকতে পারবেনা মা, একা তুমি থাকতে পারবে না, তুমি
এখানে থাকলে গায়ের অর্ধেক লােক বেঁচে যাবে, আর এই অর্ধেক
লােকের মাঝে পাবে সম্মান, আরাে পাবে তুমি আদর..........
:-চাচা তবুও আমি শহরে চলে যাব।
:-তুমি যেতে চাইলে যেতে পারবেনা, আর পারলেও থাকতে পারবে না,
শহরে বিপদে পড়লে কেউ কারাে দিকে ফিরে চাইনা, কিন্তু গ্রাম
চায়.......
শ্যামলী-২৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- চাচা তবে আর আমি শহরে যাব না।
:- এই তাে লক্ষি মায়ের মত কথা,
:- এমনি সময় পিতি খাবার নিয়ে প্রবেশ করে বললাে- খাবার এনেছি।
দই চিড়ে আর ফজলি আম।
:- খুশি হইয়া নাসির খা কহিল-এই খাবার আমি আজ একা খাব না,
আমরা সবাই মিলে খাব।
:-শ্যামলী হাসিয়া বলিল-চাচা তুমি একাই খাও আমরা না হয় একটু
পরেই খাব।
:-আবার নাসির খা কহিল-তােমরা যদি না খাও তবে আমি আজ কিছুই।
খাব না।।
:-শ্যামলী বলিল-আমরা যদি সবাই মিলে এক সাথে খায়, তাহলে তুমি
যদি শান্তি পাও তবে তায় খাব।
:-আমি জানি এই খােকা যা বাইনা করবে, তার মায়েরা পালন করবে,
কহিল নাসির খা।
:- শ্যামলী হাসিতে হাসিতে কহিল-ছােট্ট খােকার কথা তার মায়ের শুনতে
হয় আমি তােমার মা।
:-নাসির খা কহিল-এই তাে আমার মায়ের মতাে কথা।
সবাই খেতে বসিল, এ দিকে এই পর্যন্ত থাক এবার অন্য দিকে যাওয়া
যাক।
*****************************************
:-দুলি একা একা বই পড়ছিল, ফাতেমা প্রবেশ করে বললাে—দুলি আজ
বুঝি কলেজ যাবি না?
:-না, খালা কলেজ তাে আজ সরকারি ছুটি, তােমার একখানা চিঠি আছে।
মা লিখেছে।
:-তাের মা চিঠি লিখেছে, দেখি এবার কি লিখেছে?
:-খােদা ভরসা, ।
আস্-সালামু আলাইকুম,
বুবু জান আজ কত দিন গত হইয়া গেল, তােমার একটা পত্র পাই নাই।
আশা করি সবাই খােদার রহমতে ভালই আছ, খবর পেলাম জার্মান থেকে
সাজু বাড়ী এসেছে, কয়েক দিনের মধ্যে আমরা আসছি, আর কিছু
লিখলাম না।
ইতি-তােমার ছােট্ট বােন।
শ্যামলী-২৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-দুলি চা নিয়ে আসিয়া কহিল-খালা চিঠিতে কি লিখেছে মা?
:-ফাতেমা একবার চা মুখে দিয়া কহিল-তােমার মা-বাবা সবাই ভালাে।
আছে কয়েক দিন পর আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবে।
:-মায়ের সঙ্গে আব্বা আসবে না?
:-তেমন কিছু লেখিনী।
:-খালা, আব্বা আর মা যদি আসে তবে আমি মায়ের সঙ্গে যাব, কিছু
দিন বেড়িয়ে আসবাে।
:-আচ্ছা ঠিক আছে আমি আর না বলব না, আমি বুঝতে
পেরেছি,তােমার মায়ের কাছে কিছু দিন থাকবে, মায়ের কাছে গিয়ে যেন
আবার পড়াশােনা একে বারে ভুলে যেও না, লেখা পড়া না শিখতে।
পারলে জীবনে কিছুই হবে না।:-যাও এখন পড়া শােনা কর গিয়ে, দুলি
চলিয়া গেল।
:-ফাতেমা একা বসিয়া ভাবিতে লাগিল শ্যামলীর কথা- একটা এতিম।
মেয়ে, যার আপন বলতে কেউ নেই, বড় কষ্ট হয় এতকাল মায়ের মত
আদর করে এসেছি! সে আজ অসুস্থ, একটি রাত তার পাশে থাকতে।
পারলাম না, মনে মনে শ্যামলী হয়তাে দুঃখ পাবে আমার উপর।
:- এদিকে দুলিকে একা রেখে থাকতে পারলাম না, দুলির কাছে না
থাকলে একা থাকতে পারবেনা, আমার এই মন যে শ্যামলীকে বেশী
ভালাে বাসে, আমার এক মন বলছে সাজুকে না দেখতে পেয়ে, শ্যামলী
অসুস্থ বােধ করছে, আমি যে আর জেনে কিছুই ভাবতে পারছিনা!
সাজু ভুল করেছে শ্যামলীর সঙ্গে দেখা না করে, শ্যামলী সাজুর জন্য
অনেক অর্থ ব্যয় করেছে, অর্থ আমার ছিলনা, তার উপকার আমরা
কোন দিনই ভুলতে পারবনা, সাজু বিদেশ থেকে আসার পর মনটা তার
যেন কেমন, মা হয়ে কিছুই বুঝতে পারছিনা, এমনি করিয়া ভাবিতে
ভাবিতে দিন চলিয়া গেল, দিন গেল কত রাত আসিল কিন্তু ফাতেমার
চোখে ঘুম নেই, অর্ধ রাতের সময় ভাবছিল ফাতেমা, আকলিমা আমার।
সঙ্গে দেখা করতে আসবে হয়তাে, বা শুধু দেখাই করতে আসবে না,
কিছু না কিছু বলতে আসবে, সাজুর বিয়ের কথা বলবে, যদি দুলির সঙ্গে।
সাজুর বিয়ের কথা বলে তবে উত্তর আমি কি দেবাে? ইচ্ছা আছে।
শ্যামলার সঙ্গে সাজুর বিয়ে দেব, কিন্তু আমার মন বলছে আকলিমা।
শ্যামলী-২৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
অনুরােধ করবে, দুলির সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য। সাজু ডক্টর পড়তে
যাবার সময় আকলিমা বলেছিল-বুবু সাজু তাে ডক্টর পড়তে গেলাে,
বাড়ী আসলে দুলির সঙ্গে বিয়ে দেব, বুবু তােমার মত কি? তখন আমি
বলেছিলাম-দেব, কিন্তু এখন কোন কথা বলবাে, আমি যে কিছুই ভাবতে
পারছি না, বিশ বছর আগে সাজুর আব্বা মারা গেলাে, সাজুর আব্বা
মারা যাবার পর সাজুর আব্বার বন্ধু মামুন ভাই আমাদের পাশে এসে
দাড়াল, আপন ভাইয়ের মত করে দেখা শােনা করতে লাগলাে, করলাে
অনেক উপকার। সেই উপকারে আজ আমি স্বামীর ভিটেই দাঁড়িয়ে।
আছি, সাজু আজ বড় ডক্টর হয়েছে, আমার আশা পূর্ণ হয়েছে। বিশ বছর
আগে মামুন ভাই যদি আমাদের দেখা শােনা না করতাে। আজ সাজু
ডক্টর হতে পারতাে না। যার সাহায্য পেয়ে মানুষের হালে আছি তার।
মেয়েকে।
আজ কি করতে পারি। মা মরা মেয়ে শ্যামলী- কত কষ্টে মানুষ হয়েছে।
আমিই তাে তাকে মায়ের মত ভালাে বাসা দিয়েছি। আজ তাকে কেমন
করে নিরাশ করে দেব। কত প্রশ্ন মনের মাঝে ভিড় করছে। কিন্তু এত
প্রশ্নের উত্তর যে আজ খুঁজে পাচ্ছিনা। আমি ভাবতেই
পারছিনা... ..........।
:- এক কাপ চা নিয়ে আসিয়া দুলি কহিল-খালা, আজ আমি শ্যামলী
বুবুদের বাড়ীতে বেড়াতে যাব, অনুমতি পেলে যাবাে না দিলে যাব না।
:-ফাতেমা চা একবার চুমুক দিয়ে বলিল-বেশ তাে ভালাে কথা
শ্যামলীদের বাড়ীতে যাবি তাতে আমার কোন বাঁধা নেই, আমার কাছে।
অনুমতি চাইতে হবে কেন, তা যাবি কবে?
:-হাসিতে হাসিতে দুলি বলিল-আগামি কাল বৈকালে যাব, শ্যামলীর
সঙ্গে অনেক কথা আছে।
:-একাই যাবি না কারাে সঙ্গে যাবি, বৈকালে যাবি ফিরতে রাত হবে কি
না?
:-রাত যদি হয়, তবে শ্যামলী বুবুর কাছে থেকে যাব, পর দিন না হয়।
ফিরে আসবাে।
:-বৈকালে বাদে সকালে গেলে বৈকালে ফিরতে পারবি, সামনে তাের
পরীক্ষা.....
শ্যামলী-২৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-এক রাতে আর কিছুই হবে না, সেই কবে গিয়েছিলাম আর যাওয়া
হলাে না বার বার যেতে বলেছিল।
:-তবে সকাল সকাল চলে যা, শ্যামলী বড় ভালাে মেয়ে, অমন মেয়ে।
আর হয় না, তুমি গেলে শ্যামলী বড় খুশি হবে, ওর আপন কেউ নাই
আমরাই আপন। খালা, আর দেরি করবাে না, এখনই যায়। দুলি বেশ
ভালাে করিয়া সাজিয়া লইয়া তার পর যাত্রা করিল শ্যামলীর বাড়ীর।
পথে।
:-গােধূলী বেলায় একা একা বাড়ীতে ফাতেমা আবার চিন্তায় পড়িয়া
গেলাে, যে চিন্তার শেষ খুঁজে পাচ্ছে না, শুধু আকলিমার প্রশ্নের উত্তর কি
দেবে, এমনি করে এলাে মেলাে চিন্তা করতে করতে বেলা ডুবু ডুবু সময়,
আকলিমা প্রবেশ করলাে ফাতেমার কক্ষে, আকলিমার ঘরের ভিতরে
দেখে হাসিয়া ফাতেমা কহিল-তারা কেমন আছিস?
:-আমরা ভালই আছি বুবুজান, তুমি কেমন আছ?
:-আল্লাহ ভালই রেখেছে, দুলির আব্বা আসলাে না?
:-আসবে কিন্তু আমি একটু আগেই চলে আসলাম, উনি পরে আসবে,
দুলি কোথায়?
:-দুলি আজ একটু আগে শ্যামলীদের বাড়ীতে গেল।
:-শ্যামলী কে চিনতে পারলাম না তাে?
:-সাজুর আব্বার বন্ধু মামুন সাহেবের মেয়ে।
:-ওহ্, মামুন সাহেবের তাে চিনি, দুলাভাই মারা গেলে তােমার এখানে
প্রায় আসতাে।
:-হ্যা, আসতাে আর আমাদের ভালাে বাসতাে আপন কওে, আল্লাহ
আমাদের সহায় ছিল, আর মামুন ভাইয়ের সাহায্য পেয়ে অতীতের দিন
গুলি চলে গেছে সুখে দুঃখে, সেই সময় মামুন ভাইয়ের বউ মারা গেলাে,
রেখে গেলাে এই বিশাল পৃথিবীতে একটি মেয়ে ঐ শ্যামলীকে। মায়ের
আদর ভালােবাসা কিছুই তার ভাগ্যে জোটেনী, এখন তার আর কেউ
নেই! আছে শুধু একমাত্র আল্লাহ, কথা গুলাে শেষ করতে না করতে
ফাতেমার দু চোখ বেয়ে আসলাে অশ্রুবিন্দু, আর কোন কথা বলতে
পারলাে না ফাতেমা।
:-এখন কেমন অবস্থায় আছে ঐ মেয়েটি?
শ্যামলী-২৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
- খুব ভালাে আছে রাজার মেয়ের মত, তার কোন কিছুর অভাব নেই।
তার মত সুখী এ গাঁয়ে আর কেউ নেই এত সুখ থেকেও তার ভিতরে
একটা অভাব আছে..............! মামুন ভাই মারা যাবার পর সব কিছু
হারিয়েছে, তার বাবা ছিল সব কিছু, ঐ তার মা, ঐ তার বাবা, ঐ তার
বন্ধু, মামুন ভাই আমার সাজুর জন্য অনেক কিছু করেছিল কিন্তু তার
মেয়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি, কোন দিন ডেকেছিল আমার
মা বলে, কখনও ডেকে ছিল খালা বলে, আবার কখনও ডেকেছিল ফুফু
বলে। আমার মনে হয় আমি যেন তার কোনটা হতে পারবােনা। জানি।
না তার জন্য শত্রু হয়ে থাকব কি, মিত্র হয়ে থাকব?
:-বুবু জান আমি তােমার কথা বুঝতে পারছিনা শ্যামলীকে এত আপন।
করে ভালাে বাসতে হবে কেন?:-পরে তাের কাছে সব বলব।।
:-বুবু সাজু কোথায়, দেখতে পারছিনা তাে?
:-সাজু ঢাকায় গিয়েছে, কবে আসবে তাও জানি না, সাজুর জন্য এখন
আমি আর চিন্তা করি না।
:-তবে সাজু কি তােমার কথা মত চলে না?
:-তুমি সেই আগের মত পাগল আছাে? সাজু এখন অনেক বড় হয়েছে
সে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। এখন কি আর মায়ের কথায়।
চলা ফিরা করতে পারে? সে যখন শিশু ছিল তখন আমার আচল ধরে।
বেড়াতাে, আমি যা বলতাম তায় শুনতাে এখন আর আমার কথা
শােনেনা, এখন তার চলাল পথে আমি আর কোন বাধা দিই না, সাজুর।
ইচ্ছায় সাজু চলে, আমার ইচ্ছা মত নাই। সাজু জার্মান থেকে ফিরে এসে
এমনটি হয়ে পড়েছে, আগে তাে এমন ছিল না? জানি না কবে থেকে
এমন হয়েছে, থাক এ সব কথা, এখন চল খাবার ঘরে, পরে সব বলব।
ফাতেমা ও আকলিমা খাবার ঘরে চলিয়া গেল।
*****************************************
:-শ্যমলী উপর তলায় পড়ার ঘরে বই পড়ছিল।
:- ওখানে দুলি আস্তে আস্তে গিয়ে কহিল- শ্যামলী বুবু তুমি কেমন
আছ?
:- শ্যামলী পিছনে ফিরিয়া তাকাইল দেখিল দুলি, আরে দুলি কখন।
শ্যামলী-২৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আসলে? বসাে, আমি কখনও ভাবতেই পারিনী তুমি এমনি সময়
আসবে।
:- সেই কবে থেকে আশার জন্য ইচ্ছা করি, কিন্তু এ দিকে পা বড়াতে
পারিনী আজ চলেই আসলাম।।
:- ওহ, পড়া শুনার খুব জোর দিয়েছ বুঝি?
:- সামনে পরিক্ষা তাই একটু চাপ আছে বৈকি।
:-তুমি তাে বই নিয়ে পড়েই আছ বুঝি?
:- না ভাই, আমি আর তেমন সময় পায় কি, এত বড় সংসার মাথার
উপর, তার পর আবার পড়া শুনার ঠিকমত কোনটায় পারিনা, থাক এসব
কথা, খালা কেমন আছে, সাজু ভাই বাড়ী ফিরবে কবে?
:- খালা ভালই আছে, সাজু ভাই কবে ফিরবে জানি না, সাজু ভাই আজ
কাল স্বাধীন হয়ে গেছে, আমার কাছে বলছিল নিজেই হাসপাতাল। খুলবে।
:- হাসপাতাল খুলবে ঢাকায় না অন্য কোথাও?
:- আমি কিছুই বলতে পারব না।
:- শ্যামলী একটু খানি চিন্তা করিয়া লইল, তার পর বলিল, সাজু সে দিন।
এসেছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা না করে ঢাকায় চলে গেল! আজ কত।
দিন সাজুর সঙ্গে দেখা হয়নী, কেমনটি হয়েছে জানি না।
:- সাজু ভাই আগের মতই আছে, ভেবেছিলাম জার্মান থেকে ফিরে এসে
আমাদের সঙ্গে কথায় বলবে না, এখন যদি আমরা কথা না বলি তবে
সাজু ভাই নিজেই কথা বলে, আরাে বলে কি তােদের সঙ্গে সারাক্ষন কথা।
বলতে ইচ্ছা হয়।
:- যারা ডক্টর হয় তারা যেন সবার কাছে ভালাে হয়, ছােট্ট বেলায় সাজু।
ভাই খুব ভালাে ছিল, আমি দোয়া করি আগামী দিনে যেন আরাে ভালাে
হয়, আচ্ছা দুলি তুমি কি ডক্টর পড়বে?
:- আমি আইন জীবি হতে চেয়েছিলাম কিন্তু সাজু ভাই ডক্টর পড়তে
বলছে, তাতে নাকি সাজু ভায়ের উপকার হবে, আমি জানি না তার কোন
উপকার করতে পারবাে।
:- সাজু যদি ডক্টর পড়তে বলে, তবে ডক্টর পড়বে, দুনিয়াতে মানুষের
সেবা করা বড় ধর্ম।
শ্যামলী-৩০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- দেখি ভাগ্যে কোনটা জোটে, জোর করে তাে আর কিছু করা যায় না।
:- শ্যামলী টানা একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিল- তা ঠিক, ভাগ্য লিপি সব।
চেয়ে বড়, বিধাতা কপালে যা লিখেছেন তাই হবে, জোর করে কিছুই করা
যায় না।।
:- একটু চুপ থাকিয়া দুলি কহিল- আচ্ছা বুবু তােমার ইচ্ছা কি, আইন,
অন্য দিকে?
:- আমার ইচ্ছা আজো ঠিক করতে পারিনী।।
:-চা নিয়ে আসিল পিতি, বলিয়া গেল- বুবু তােমাদের চা, আমার আসতে
একটু দেরি হয়ে গেছে।
:-হাঁসি মুখে দুলি বলিল- না-না মােটেই দেরি হয়নী, আমি তাে এই মাত্র
আসলাম, আসলে পিতি বুবু, সব কিছু তাড়া তাড়ি করতে পারে।
:-এক গাল হাঁসিয়া পিতি কহিল- এত সুনাম আমার আর করতে হবে না,
চা টা কেমন হয়েছে তায় বল?
:-এক বার মুখে দিয়ে দুলি কহিল-খুব ভালাে।
:-সত্যি পিতি বুবু খুব ভালাে চা তৈরী করতে পারে।
:-শ্যামলী পিতি কে বলিল, আমাদের দু-জনার চা, তাের চায়ের কাপ
কোথায় রাখলী। :- বুবু আমার চা আমি নিজেই তৈরী করিনী।
:-শ্যামলী বলিল- তবে আর একটা কাপ নিয়ে আয় এক কাপ চা আমরা
দুজন মিলে খায়। :-পিতি কহিল- না বুবু আমি চা খাব না।
:-একটু দম ধরে থেকে শ্যামলী কহিল- কেন?
:-পিতি কাহিল- বুবু আমার অনেক কাজ বাকি, এখন কি করতে হবে তায়
বল।
:-কি খাবার তৈরী হবে, শ্যামলী ভাবিয়া বলিল- দুলি আসলাে আজ
আমাদের খাবার ভালই হবে, পােলাও হলে সব চাইতে ভাল হয়।
:-দুলি, শ্যামলীর মুখের কথা কাড়িয়া লইল কহিল- পােলাও থাক ডাল
ভাত হলে, সেই ভালাে হবে।
:-একটু নিরব থাকিয়া শ্যামলী বলিল- কোন কথা চলবে না, আমি যা
বলব তায় হবে, আমার আপন বলতে কেউ নেই, তায় নিজের জন্য
শ্যামলী-৩১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
তেমন ভালাে খাবার তৈরী করা হয় না, খালা যখন আসে তখনই চলে।
যায়, আর সাজু ভাই তাে অনেক দিন আসেনি, তাের জন্য আজ
খাওয়াটা আমাদের ভাল হবে।।
:-দুলি একটু হাসিয়া বলিল- আচ্ছা সাজু ভাই বাড়ী আসলে আমিও তার
সঙ্গে করে নিয়ে আসবাে, এই তাে এক সপ্তাহ গত হতে কতটুকু সময়,
আজকের খাওয়া ডাল ভাত অনেক ভাল।
:-একটু নিরব থাকিয়া শ্যামলী কহিল- সাজু ভাই তােকে খুব ভালাে।
বাসে?
:- ভালাে বাসে মানে, সাজু ভায়ের মত মানুষ আর হয় না।
:- তােকে অন্তর দিয়ে ভালাে বাসে, আমিও জানি, সাজু ভাই বড় ভালাে।
মানুষ, তার মত আর দ্বিতীয় নাই, সেই ছােট্ট বেলার কথা আজো
ভুলিনী,
চির দিনই তার মনটা ভালাে এবং আমি দোয়া করি যেন সাজু ভাই
অনেক বড় হয়------
:- আমিও দোয়া করি যেন সাজু ভাই অনেক বড় হয়।
:-আচ্ছা বুবু আমি একটা কথা মনে করে এসেছি, অনেক দিন গত হয়ে।
গেল বাড়ি যায়নী, এবার আমি যাবার সময় তােমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবাে।
:-হাসিয়া শ্যামলী বলিল- আচ্ছা আমি যাব তা কবে সেদিন? |
:-দুলি হাসিতে হাসিতে কহিল- আমি মনস্থির করেছি সাজু ভাই ঢাকা।
হতে আসলে তার পর যাব।
:- আমি কথা দিলাম এক দিন যাব।।
:- বুবু আমার সঙ্গে যাবে তাে?
:- দুলি, আমি তােদের কত আপন করে ভালাে বাসি, সে কথা কেমন
করে বুঝাব, আমার আর কে বা আপন আছে, যে তার কাছে ছুটে যাব।
যখন আমার মন ছােটে তখন খালার কাছে ছুটে যায়, আবার ফিরে
আসি, তা আবার যে দিন মন ছুটবে সেই দিন চলে যাব এই টুকু কথা
দিলাম---, আর সাজু ভাই আসুক তার পর সবাই মিলে এক সঙ্গে যাব।
:-দুলি একটু ভাবিয়া বলিল- সেই ভালাে হবে, কথা গুলি বলা শেষ,
তাকিয়ে কহিল- মা তুমি কেমন আছ, কখন আসলে? দুলি, পরিচয়।
করিয়ে দিল, শ্যামলীকে বলিল এই আমার মা।।
শ্যামলী-৩২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-শ্যামলী হাসি মুখে বলিল- আচ্ছালামু আলাইকুম, কেমন আছ খালা,
এখানে বসাে, আমি আসছি বলিয়া চলিয়া গেলাে, সঙ্গে পিতিও চলে।
গেলাে।
:-আকলিমা চারিদিকে তাকিয়ে দেখিয়া লইল, তার পর দুলিকে বলিল-
মেয়েটা কি একাই থাকে এই বিশাল বাড়িতে, না অন্য কেউ থাকে?
:- শ্যামলী বুবুর আর তাে কেউ আপন নেই, থাকবেই বা কে, ঐ কাজের
মেয়েটি আর তার স্বামি থাকে, ওরা দু’জন নিচের তালায় থাকে, আর বুবু
থাকে দুই তলায় ঐ ঘরে, এটা বুবুর পড়ার ঘর, আর বাকি ঘর গুলাে
পড়েই থাকে, থাকবে কে বল!
:- মেয়েটার বয়স হয়েছে কিন্তু বিয়ে হয়নি কেন?
:- এমন বেশি বয়স নয় আমার বয়সি।
:- থাক তাের কথা, ঐ বয়সে বিয়ে হতে কারাে বাকি আছে?
:- মা তুমি অমন কথা বলছ কেন? আমার তাে বিয়ে হয়নী, তা ছাড়া
শ্যামলী তাে পড়া শুনা করছে।
:- থাক ও সব কথা এখনী তােকে বাড়ী যেতে হবে।
:- আজ রাতে থাকতে হবে, বুবু তাে যেতে দেবে না, আমি যেদিন বাড়ী
যাব বুবুকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব, বুবু আমার সঙ্গে যেতে চেয়েছে।
:- আমি কার বাড়ী থাকতে আসিনী এবং কারাে নিতেও আসিনী, যা বলছি
তাই শােন। -দুলি একটু চিন্তা করিয়া বলিল- মা! আমরা যা বলছি বুবু তা শুনে
ফেলবে, শুনলে কি মনে করবে বলাে তাে?
:- কে কি মনে করবে, তা আমার জানার দরকার নেই, যদি কেউ কিছু
শােনে তাও আমার বলার কিছু নেই।
:- মা আজ শ্যামলী বুবুর কেউ নেই! সে জানে বা ভাবে, আমরা তার
আপন, কিন্তু তুমি তাকে এমন করে বলছ কেন!!? জীবনটা তার বড়
দুঃখের------
:- শ্যামলী আমাদের আপন কেউ নাই, তাকে আমি আপন করে ভাবতে
পারিনা, তুমি আমার মেয়ে হয়ে আপন করে ভাবতে পারলে কি করে?
:- মা, তুমি আমার না হয় দুরে রাখলে, কিন্তু খালা কেমন করে দুরে
রাখবে বল, খালা যে তাকে মানুষ করেছে।
শ্যামলী-৩৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- এসব কিছু ভাবতে হবে না, দেখবে আমি ঠিক করে নেব।
:-আঁড়ালে দাঁড়িয়ে শ্যামলী কথা গুলাে সব শুনল, তার পর নিজে হাতে চা
নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে বলল, খালা তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? বস চা
খাও।
:- আমি চা খেতে আসিনী, আর চা কোন দিনই খায় না, দুলিকে নিতে
এসেছি, দুলি আমার সঙ্গে এখনই যাবে।
;- দুলি মধ্যে মাঝে আমার কাছে আসে, আর তুমি তাে কোন দিনই
আসনী, কয়েক দিন থাকার পর যাবে।
:- না তা হয় না, যেখানে পুরুষ মানুষ নেই, সেখানে কোন ভদ্র মহিলা
থাকতে পারে না।
:- খালা আমি বড়ই দুঃখি মেয়ে, তুমি আসার আগে দুলির সঙ্গে কথাটা
বলছিলাম, আমার আপন কেউ নেই, যে বাড়ী পুরুষ মানুষ নেই সেই
বাড়ী কোন দ্র মহিলা থাকতে পারে না, আমিও জানি কিন্তু কি করব
বল!? তােমরা আমার বাড়ীতে এসেছ, দেখে আমি বড়ই খুশি হয়েছিলাম,
বড় আনন্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু আজ আমার বাবা নেই, ভাই নেই, কিসের
বলে দ্র মেয়েদের স্থান দেবাে, কিন্তু আমার একটা অনুরােধ তােমাদের
জন্য, যে খাবার তৈরি করা হচ্ছে একবার মুখে দিয়ে যাবে, আমি আর
বাধা দিয়ে তােমাদের রাখতে চাইব না, আজ যদি আমার একটা ভাই
থাকতাে, তাহলে তােমরা যেতে না! আমার দুঃখ এই পৃথিবীর মানুষ কেউ
বুঝতে চায় না! অন্য কারাে বুঝার দরকার নেই!
আমার দুঃখ আমিই বুঝি------------- এ সব কথা থাক, কিছু মুখে দিয়ে
গেলে আমি খুশি হবাে, আর অল্প সময়ের ভিতরে তােমাদের জন্য খাবার
তৈরী হয়ে যাবে।
:-দুঃখীত কণ্ঠে দুলি বলিল- বুবু তুমি তাড়া তাড়ি যাও, আমাদের জন্য।
খাবার নিয়ে আসতে বল, যেতেই যখন হবে, তখন আর দেরি করে লাভ
কি? অনেক দিনপর মা এসেছে তাে।
:- হাঁ তােমরা একটু সময় সবুর করাে, আমি তােমাদের জন্য খুব তাড়া
তাড়ি করবাে, বলিয়া চলিয়া গেল শ্যামলী।
:-দুলি মায়ের প্রতি রাগ করিয়া কহিল- মা তুমি কেমন মানুষ বলাে তাে,
শ্যামলী-৩৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
শ্যামলী তােমার কথায় কতটা দুঃখ পেলাে, তা কি তুমি জান্তে পেরেছে!?
:- তার ভাই নেই, বাবা নেই, সে যদি থাকতে পারে তবে আমাদের অসুবিধা
কি? আমরা এখন আছি, একটু পরে নাও থাকতে পারি, চলেই যদি যাব,
তবে এত কথা বলার দরকার কি?
:-দরকার ছিল, আমি যা বুঝি তাের চেয়ে বেশি বুঝি, আর আমি যা বলি
তা চিন্তা করেই বলি, যত সব।
:- মা তুমি এমন কথা আর কোন দিন বলাে না।
:- দেখ দুলি, আমি যা বলি তায় করি মনে রাখিস।
:- সে আমি অনেক দিন আগে থেকে জানি, কিন্তু সব কিছুর ভাবনার বিষয়
আছে।
:- তুই যা ভাবিস, আমি তা ভাবি না, আমি যা করতে পারি না, সবার
ভাবনা একই রকম হবে, তার কি মনে আছে? জানিস তাে আমি অন্য
রকম মেয়ে, তাের বাবা আমার কথায় জবাব দেয় না।
:- মা, আমার বাবা তােমার চেয়ে বুদ্ধিমান, তায় তােমার কথার জবাব
কোনদিন দেয় না, বাবার চেয়ে যদি তুমি বুদ্ধিমতি হতে, তবে নিরব
থাকতে, কোনদিন বাবার কথার জবাব দিতে না।
:- খালার আদরে মুখে অনেক কথা শিখেছে, এক বারই বলেছি তাের বাবা
আমার কথায় আজোও কোন জবাবদিহি করতে সাহস করেনি।
:- আমার বাবার মত মানুষ আর হয় না, আমি মনে করি।।
:- দুলি তুই আমার সঙ্গে বড় বাড়া বাড়ি করছিস, সব কিছুর একটা সিমা
আছে, সেই সিমা পার হয়ে গেলে, তখন ধরা ছােয়ার বাইরে চলে যায়,
তাকে নিয়ে আর কিছুই করা যায় না, তেমনি যেন তুই-------
:- মা, আমি তাে বাবার মেয়ে নয়, যে ধরা ছােয়ার বাইরে চলে যাব, আমি
যেমন ছিলাম তেমনি থকব।
:- তাের বাবার চেয়ে বুদ্ধি আমার কম?
:- হ বাবার চেয়ে বুদ্ধি তােমার কম।
:-শ্যামলী, গােপনে একটু দুরে থাকিয়া, ও মেয়ের কথা গুলাে সব
আবার শুনিয়া লইলাে, ওদের কাহার মনে কি, শ্যামলী সব বুঝিয়া
ফেলিল, তার পর আস্তে আস্তে ঘরের ভিতরে গিয়া কহিল- খালা,
তােমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসছে, দুলি তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসাে
শ্যামলী-৩৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আর আমি খালার হাত নিজেই পরিষ্কার করে দিচ্ছি.........
:-আকলিমা একটু রাগ করিয়া কহিল- থাক তােমার পরিষ্কার করতে হবে
, আমি নিজেই পারব।
:-শ্যামলী কিছু মনে না করিয়া, খাবার গুলাে নিজে রেখে দিতে লাগলাে,
আর বলিতে লাগলাে- খালা, এই পৃথিবীর সব মানুষকে ভালাে বাসতে
চায়, কিন্তু আমার ভালাে বাসার মূল্য কেউ দিতে চায় না! সত্যি কথা
বলতে কি আমার ভালাে বাসার মূল্য পেলাম না, কেন পেলাম না জানি
না।
:-আকলিমা কহিল-এই দুনিয়ায় যার কেউ নেই, তাকে কে ভালাে বাসবে।
বলাে তাে?
:-শ্যামলী কোন কথার উত্তর না দিয়া বলিল- তােমার কথায় ঠিক, দুনিয়ায়
যার কেউ নেই, তাকে আবার ভালাে বাসবে কে, যেমন এই জগতে
আমার কেউ নেই, তায় আমারও কেউ ভালাে বাসতে চাই না!!!
:-শ্যামলীর কথা গুলাে শুনিয়া আকলিমা একটু লজ্জিত হইল, তার পর
শ্যামলীর মুখের দিকে চেয়ে রইল এবং কহিল, বেলা প্রায় শেষ, এবার
আমাদের যেতে হবে, আর এক দন্ড থাকা যাবে না, শ্যামলী তুমি কিছু
মনে করাে না, ধরে রাখলেও থাকতে পারবাে না, সময় করে তুমি যাবে
কেমন....
:- যাব খালা, যদি খােদা নিয়ে যায়, তুমি আবার কবে আসবে কথা দিয়ে
যেতে হবে।
:- আমার তাে কোথাও যাবার সময় নেই, দেখি আবার আসতে পারি
কি-না, কিন্তু কথা দিয়ে যেতে পারবাে না, তুমি তাে আবার এই বাড়ী
রেখে মনে হয় কোথাও যেতে পার না, আমি এই অল্প সময়ের মধ্যে সব
বুঝতে পেরেছি, আজ আমি চলি তুমি কিছু মনে করাে না। আমি আসি
বলিয়া চলিয়া গেল, আকলিমা ও দুলি, তার পর দুলি পিছিয়া আসিল,
শ্যামলীর সামনে দাঁড়াইল তখন শ্যামলীর দু-চোখ বেয়ে অঝরে অশ্রু
নামিয়া আসিল, আতকে উঠছিল এবং ঠোট দুইটা ভিষন ভাবে কাপছিল!
কিছুই বলিতে পারছিল না শ্যামলী!!
! :-ছােট্ট করে বল্লো দুলি- বুবু তুমি আর কেঁদো না, আমি খালার সঙ্গে
আবার আসবাে, কথা দিয়ে গেলাম, কিন্তু তুমি আমাদের বাড়ীতে যাবে
শ্যামলী-৩৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
কিনা জানি না...........
:-শ্যামলী কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে কহিল-তুমি কথা দিয়ে যাও, আবার কবে
আসবে?
:- আমি অনুরােধ করে বলছি!
:-দুলির চোখেও অশ্রু ছল ছল করছিল, কিন্তু আর কিছু না বলিয়া চলিয়া
গেল, আকলিমা অনেক আগেই বাড়ীর বাহিরে চলিয়া গিয়াছে।
:-শুধু একা রইলাে দাড়িয়ে দরজার মাঝখানে শ্যামলী- থেকে থেকে হৃদয়
কঁদিয়া উঠিতে লাগিল, একা একাই বলিতে ছিল- যার এই দুনিয়ায় মাব-
ভাই-বােন নেই, তাকে কিছু লােক এমনি করেই অবহেলা করে!
আমি যে সবাইকে ভালাে বাসতে চায়, সকল মানুষকে ভালাে বাসি, কিন্তু
কেন ওরা আমার এত দুঃখ দেয়, আমি তাে কারাে দুঃখ দিই না!
-এমনি সময় পিতি আসিয়া কহিল- বুবু তুমি কাঁদছ কেন?
:-শ্যামলী কোন কথা কহিল না।
:- বুবু তুমি কাঁদছ কেন?
:- খােদা যে আমার কাদবার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, আমি কাঁদব না
তবে কে কাঁদবে কে! আমি যে একা....
:- এমনি করে কেঁদে কেঁদে কি লাভ পাও বলাে তাে?
:- আমি কেঁদেই শান্তি পাই, বিধাতা সুখ না দিয়ে দুঃখ দিয়েছে, তার
মাঝে দুঃখটা চলে আসে।
:- বুবু তােমার চোখে পানি দেখলে আমার বড় কষ্ট হয়, তােমার সুখেই
তাে আমাদের সুখ, তুমি দুঃখ পেলে আমরা বড় দুঃখ পাই! তুমি
হাসি-খুশিতে থাকতে পারলে আমরাও হাসি ভরা মন নিয়ে বেড়াতে পারি,
দুঃখ আর করনা বুবু, আমি যখন তােমার হাসি দেখতে পাই, তখন আমি
আমার মায়ের মুখ দেখতে পাই তােমার মাঝে, তােমাকে খুশি দেখলে
আমার মায়ের মমতা খুজে পাই তােমার মাঝে, তােমাকে আনন্দ করতে
দেখলে আমি দুনিয়ার সমস্ত দুঃখ ভুলে যায়, আমার মনে কত সুখ অনুভব
করি! এরপর যদি তােমায় আবার কখনাে চোখের অশ্রু ঝরতে দেখি,
তখন আমার কেমন লাগবে!!!?
:-শ্যামলীর হৃদয় কাঁদিয়া উঠিল, নিজেকে একটু সামলিয়ে নিল, তারপর
কহিল, এইতাে হাসছি তুই একবার হাস.....
শ্যামলী-৩৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- হাসিতে চাইলে হাসা যায় না, কাদিতে চাইলেও কাদা যায় না, বুবু তুমি
কেন বুঝতে পার না, আমাদের মাঝেও আনন্দ আছে, পৃথিবীর সবাই যদি
হাসি-খুশির ভিতরে থাকতে পারে, তবে তােমার অনেক কিছু থেকেও
কেন আনন্দে থাকতে পারাে না, দুনিয়ায় যার জন্ম আছে তার মৃত্যু আছে,
আমাদের পিতা-মাতা আগেই পরপারের পথের যাত্রী হয়ে গেছে, আমরা
যদি আগে যেতাম তবে ওরা অনেক দুঃখ পেত!-----
পিতি, তাের কথাগুলাে অনেক ভালাে, সব কথার মূল্য আছে আই তুই
আমার বুকে আয়, তুই ছাড়া আমার দুঃখ আর কেউই বুঝতে চাইনারে।
সত্যিই আমাদের জীবন, সাগরে ভেসে চলেছে, জানি না কবে কখন,
কোথায় কিনারা পাবাে তাও জানিনা, পিতির চোখের জল মুছিয়া দিয়া
তার নিজের ঘরে চলিয়া গেল।
****************************************
ঠিক তখনই মাগরিবের আজান ধ্বনি ভাসিয়া আসিল।
:-ফাতেমা নামাজ শেষ করিয়া মােনাজাত করিতেছিল, এমনি সময় ঘরের
ভিতরে প্রবেশ করিল আকলিমা ও দুলি।
:-দুলি ও তার খালার মােনাজাত করিতে দেখিয়া তার মায়ের ডাকিয়া
বাইরে বসিবার জায়গা করিয়া দিয়া বলিল- মা, খালা এখন মােনাজাত
করছে, এই খানে চুপ চাপ বসে থাক, খালার মােনাজাত শেষ হলে যা
খুশি গল্প করিও, আমি চা নিয়ে আসি বলিয়া দুলি চলিয়া গেল।
:-একটু খানি চিন্তা করিয়া আকলিমা কহিল- এই বাড়িতে একটা কাজের।
মানুষও নেই, সব কাজ বুবু জান সারা জীবন একাই করে গেলাে।
:-দুলি তার মায়ের কথা গুলি শুনিয়া ফিরিয়া আসিল, কহিল- মা, আমি
আগেই বলেছি খালার মােনাজাত শেষ না হলে কোন কথা বলবে না।
:-দুলির কথা শেষ না হতেই আকলিমা কহিল- তবে কি আমি একা বােবা।
হয়ে বসে থাকব নাকি?
:- মা তুমি একটু বেশি কথা বলাে।
:- আরে আমি একটা কথা বলতে না বলতে বেশী কথা বলে ফেলেছি, যত
সব.........
শ্যামলী-৩৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-মা, তুমি আমার মা, তােমাকে কি আর বলব।
:- তুই আমার আর কি বলবি?
:-ফাতেমা মােনাজাত শেষ করিয়া বাহিরে আসিয়া কহিল-দুলি তাের
কাজে তুই যা, আমি তাের মায়ের সঙ্গে কথা বলছি, তাের মা চিরদিনই
এমন, একটু বেশী বেশী কথা বলে, কথা গুলাে শুনিয়া দুলি চলিয়া গেল।
:-একটু খানি চুপ থাকিয়া আকলিমা কহিল-আমি চিরদিনই এমন, ভালাে
কথা বলা দোষ, এবার আমি চুপ করে গেলাম।
:-না তুই চুপ করে থাকবি কেন? কত দিন পর আসলি, আমরা দুই বােন
গল্প করি।
:- আমি আর কি গল্প জানি যে সেই গল্প করবাে।
:- তাের মনে পড়ে যে গল্প সেই গল্প কর।
:- আমি গল্প করবাে আর তুমি শুনবে, তবে শােন, আচ্ছা বুবু আমি গল্প।
বলব না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবাে, তুমি কি মনে করবে জানি না,
কথাটা তােমার জানানাের দরকার।
:- বল কি বলবি?
:- আচ্ছা বুবু, দুলিকে যে বাড়ীতে পাঠিয়েছিলে, ঐ বাড়ীতে উপযুক্ত মেয়ে
পাঠান কি ঠিক হয়েছে?
:- কেন কি হয়েছে? শ্যামলী খুব ভালাে মেয়ে, শ্যামলীর মত মেয়ে আর
হয় না।
:- বুবু যে বাড়ীতে পুরুষ মানুষ নাই, সেই বাড়ী আমার মতে নিরাপদ
নাই, তুমি কি মনে করাে?
:-আকলিমা তাের ধারনা ভুল, এই গ্রামের মানুষ সবাই শ্যামলীকে
ভালােবাসে, কেউ ক্ষতি করতে পারে না, আমি জানি ঐ বাড়ীতে ওরা
নিরাপদে থাকে।
:- তুমি নিরাপদ মনে করতে পার কিন্তু আমি পারি না, তাতে তুমি আমার
ভালই বলাে আর মন্দইবা বলাে।
:- তুই বােঝার চেষ্টা না করলে আমি বােঝাতে পারব না, কেন যে।
ভালােবাসে সে খবর আমি জানি।
:-দুলি চা নিয়ে আসিয়া কহিল- এই চা টা খালার, আর এই চা টা
শ্যামলী-৩৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
মায়ের, আমি আমার পড়ার ঘরে চলিলাম, আর কোন কথা না বলিয়া দুলি
চলিয়া গেলাে।
:-হাঁ যা বলছিলাম শ্যামলীকে, এমনি করে তাের ভাববার কোন দরকার
নেই, সে কি তাের আপনজন, যে তার জন্য ভাবতে যাবী।
:- বুবু আমি একটা কথা বলব, তুমি দুলিকে ডাক দাঁড়াও।
:- দুলিকে ডাকতে হবে, আচ্ছা ডাকছি, দুলি, দুলি একবার এদিকে আয়
মা, দুলি আসিয়া সামনে দাড়াইল, আমার কাছে আয় মা, তাের মা যেন
কি বলবে।
:- এখানে বুবু আছে, দুলি আছে ও আমি আছি, নেই শুধু সাজু, সাজু
থাকলে ভালাে হতাে, সবার সামনে কথাটা বলতে পারতাম।
:- এখন কি বলতে পারসিছ না?
:- আমি সাজুর সঙ্গে দুলির বিয়ে দিতে চায়, এই বিয়েতে কেউ অমত
করতে পারবে না।
:- আমি এই বিয়ের ব্যাপারে কিছুই বলতে পারবাে না, সাজুর কাছে।
শুনবাে তার পর কথা বলব।
:-দুলি কয়টা কথা শুনিয়া কহিল- ‘মা’ তােমরা বলা বলি করাে আমার
কাজে আমি গেলাম, দুলি চলিয়া গেলাে।
:-আকলিমা কহিল- দুলির মতামত আমি দেখব, সাজুর সঙ্গে তুমি কথা
বলাে, আমার বিশ্বস, সাজু তােমার কথা শুনবে?
:- সাজু আমার কথা নাও শুনতে পারে, সাজু কি আগের মত ছােট্ট খােকা।
আছে, আমি যা কিছু বলব নিরবে সে তাই শুনবে, তার সঙ্গে কিছুই বলতে
পারবাে না।
:- বুবু, তবে কি আমি বুঝেনিব, তুমিই রাজি হতে পারছ না?
:- তুমি কেন বুঝতে পারছ না, সাজুর আজ বােঝার বয়স হয়েছে, সে
আমাদের কথা নাও রাখতে পারে।
:- তুমি যদি রাজি হতে, তবে সাজু রাজি হতাে, যদি পার তবে তুমি
একবার বলে দেখ, সাজু যদি রাজি হয়, তবে আমি রাজি আছি, আর সাজু
যদি রাজি না হয়, তবে আমিও রাজি হতে পারবাে না।
:- বুবু তুমি দুলিকে বেশি ভালােবাস না শ্যামলীকে?
:- বড় কঠিন প্রশ্ন, আমি কি জবাব দেবাে, কিছুই ভাবতে পারছি না,
শ্যামলী-৪০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
কেমন করে তােকে জবাব দেবাে---, তবে শােন, তাের দুলাভাই যেদিন।
মারা গেল তার পর আমরা বড় একা হয়ে গেলাম, তখন আমাদের
দেখবার মত আর কেউ ছিলাে না, ঐ বিপদের সময় সহায় হয়েছিলাে
মামুন ভাই, মামুন ভাই ছাড়া আর আমাদের দেখবার কেউ ছিলাে না,
সাজুকে নিয়ে আমি হতাশ।
হয়ে পড়লাম, তার পর মামুন ভাই আমাদের একমাত্র উপকারের বন্ধু
হয়ে গেলাে, একদিন মামুন ভাই তার নিজের হৃদয়ের মাঝখানে সাজুকে
স্থান দিল, লেখা-পড়ার ভার নিজের মাথায় নিলাে, এমনি করেই সাজুর
সমস্থ চাহিদা পূরণ করতে থাকলাে, তার এই অবদান কোনদিনই ভুলতে
পারব না, তখন আমার একটু খানি সাহায্য কেউ করতে পারিনী! আমার
সেই বড় বিপদের সময় সহায় হয়েছিল একমাত্র মামুন ভাই, আজ মামুন
ভাই নেই, রেখে গেছে একমাত্র মেয়ে, তাকে আমি কোন চোখে দেখব
তুই বল? তাকে আমি নিকটে রাখবনা অনেক দূরে রাখব?
:- বুবু আমি তােমার কথা বুঝতে পেরেছি, তুমি দুলিকে স্বীকার করতে
পারছ না, আমি যা বলেছি সে কথা রাখতে পারছ না, বড় আশা করে
তােমার কাছে এসেছি, এমন কি দুলির আব্বার কাছেও বলে এসেছি,
এখন বাড়ী ফিরে গিয়ে দুলির আব্বার কাছে কি বলব, কিছুই ভাবতে
পারছি না!
:- দুলির কথা তােকে চিন্তা করতে হবে না, আমি একটা ভালাে ছেলে।
দেখে বিয়ে দিতে পারবাে।
:- আমি আগামী কাল চলে যাব, দুলির এখানে রেখে যাবাে না, সঙ্গে
করে নিয়ে যাবাে।।
:-হঠাত সাজু আসিয়া ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল কহিল- ‘মা’ তুমি।
এই কয়দিন কেমন ছিলে? খালা তুমি কেমন আছ, কবে এসেছ?
:-হাঁসি মুখে আকলিমা কহিল- এই তাে আজই আসলাম, জার্মান থেকে
দেশে ফিরলি আমার দেখতে গেলিনা?
:-সাজু কহিল- জার্মান থেকে সবে মাত্র আসলাম এক-এক করে সবার
বাড়ীতে যাব ভাবছি।
:- হয়তাে আমি পর হয়ে গেছি তাইনা?
:- এ কথা বলছ কেন খালা? তােমরাই তাে আমার আপনজন, তােমরা।
শ্যামলী-৪১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-কথা গুলি শুনিয়া আকলিমার মনে নানা রকম চিন্তা আসিল।
কিছুক্ষণ পর বলিল- সাজু তুমি তাে আগে কখনও এমন ছিলে না?
কিন্তু, আজ সেই আগের মত নেই, অনেক বদলে গেছ।
: -হাঁসিতে হাসিতে সাজু বলিল- না, খালা, আমি সেই আগের মতই
আছি, বদলাইনী একটু খানিও।
:- আমি বুঝতে পেরেছি তুমি বদলে গেছ, আচ্ছা সব কথা থাক,
আমি আগামী কাল চলে যাব, আমার সঙ্গে তাের যেতে হবে, জানি
তুই অমত করবি না।
:- খালা, আগমী কাল আমি যেতে পারবাে না, ঢাকা যাবার আগে
তার সঙ্গে কথা দিয়েছি, বাড়ী ফিরে দেখা করবাে, আমি ঐ খানে
আগে যাবাে খালা, আর তুমি কাল যাবে কেন, কত দিনপর দেখা
হলাে, কয়েক দিন থাকবে তার পর বাড়ী যাবে।
:- আমার মনটা বড় ভালাে নাই সাজু।
:- কয়েকদিন এখানে থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
:- ফাতেমা সবাই কে বলিল- তােরা সবাই গল্প কর, আমি আসছি,
সােবার ঘরে গেলাম।
:-সাজু কহিল- আরে তাের মুখে কথা নেই কেন?
:-দুলি হাসিয়া কহিল- সাজু ভাই তােমার তাে লেখা-পড়া শেষ হয়ে
গেছে, আর আমার লেখা পড়া এখনও অনেক বাকি, তুমি মায়ের
সঙ্গে কথা বলাে আমি ঘরে গেলাম, বিনা কারনে আলাে জ্বলছে।
দলি ও ফাতেমা নিজ নিজ ঘরে চলিয়া গেলাে।
:-সাজু বলিল- খালা, আমি তােমার সঙ্গে যাব, মাত্র একদিন থাকব,
তােমার সঙ্গেই যাব, দুলিও যাবে, কয়েক দিন থাকবাে আমরা তার
পর দুলি আর আমি এক সঙ্গে ফিরে আসবাে, আমারও মন আছে,
এই মন সব জায়গায় যেতে চায়, সবেমাত্র বিদেশ হতে দেশে
ফিরলাম আমার ইচ্ছা সবার সঙ্গে দেখা করতে।
:-চা নিয়ে আসিয়া ফাতেমা কহিল- তােদের জন্য চা নিয়ে
আসলাম, দুলি আবার কোথায় গেলাে।
শ্যামলী-৪২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ছাড়া আমার আর কেবা আপন আছে বল? মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সাজুসাজু
কহিল- ‘মা’, দুলি কোথায় এখানে তাে দেখছি না? সাজু
:-মুখ তুলিয়া ফাতেমা বলিল- দুলি তার পড়ার ঘরে, সামনে তার।সাজু
পরিক্ষা, পড়া শােনা করছে, এখানে আসতে বলবাে? সাজু
:- আসবে না মানে এখনী আসবে, সাজু নিজেই ডাকিল- দুলি, দুলি, ওসাজু
দুলি তুই কোথায় এদিকে আইতাে।সাজু
:-হাঁসতে হাঁসতে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিয়া দুলি বলিল- ভাই তুমিসাজু
কেমন আছ, কখন আসলে? সাজু
:- এই তাে, এইমাত্র আসলাম আবার কাল চলে যাব। সাজু
:-ফাতেমা কহিল- কাল আবার কোথায় যাবি?সাজু
:- মা, আমার যাবার জায়গা কোথায় আমি নিজেই জানিনা, সাজু তারসাজু
মনের কথা মায়ের কাছে প্রকাশ করিল না, চোখে তার বিন্দু বিন্দু জলসাজু
ছল-ছল করছিল, কেহই তাহা বুঝিল না!সাজু
:-ডান পাস থেকে দুলি বলিল- সাজু ভাই, আবার ফিরবে কবে?সাজু
:-ভয় নেই সন্ধার আগেই ফিরে আসবাে, বেশী দূরে যাব না, আসেসাজু
পাসের কোন এক জায়গায় যাব। সাজু
:-মায়ের মন যেন কেমন হয়ে গেলাে!, সাজু তার মনের কথা মায়েরসাজু
কাছে না বলিলেও তার হৃদয়ে কিছুটা ছোয়া লাগিল। সাজু
:-কহিল ফাতেমা- কয়েক দিন বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে পারবিনা।সাজু
:- না, মা আমার যেতেই হবে, জার্মান থেকে এসে তার সঙ্গে দেখাসাজু
করতে গিয়েছিলাম কিন্তু, দেখা পায়নী, সে আমার খুব কাছের মানুষ,সাজু
ভােরবেলা না গেলে ধরতে পারবাে না, তায় কোন কথা নাই, যেতেইসাজু
হবে। সাজু
:- আগামী কাল তােকে যেতে দেব না। সাজু
:- মা, আমি আজ বড় হয়েছি, আমার স্বাধীনতা আছে, আমি কি নিজেরসাজু
ইচ্ছায় কোথাও যেতে পারবাে না, তুমি বল? আমি যেখানে যেতে চাইসাজু
সেখানে একবার যেতে দাওনা আমার লক্ষি--------- “মা”।সাজু
:- সাজু তাের সুখের জন্য আমি বাধা দেব না, তাের যেটা ভালাে সেটাসাজু
করতে পারিস, কিন্তু কোথায় যে যাবি সে কথা আমার কাছে বলে যাবি।সাজু
না বাবা?সাজু
শ্যামলী-৪৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- মা, আমি তােমার কাছে সব কিছু বলব, কিন্তু আমি আগে গিয়ে।
, জানবাে, তার পর তােমাকে তাে জানাবােই।
:- দেখ তাের যেটা ভালাে সেটায় কর, আমি তাের ইচ্ছার বাহিরে
কোনদিন যাবাে না, আর যেতে চাইনা
:-সাজু কহিল- মা, তােমরা দুই বােনে গল্প করাে, আমি দুলির চা
টা দিয়ে আসি, সাজু দুলির ঘরে চলিয়া গেলাে।
দুই বােন সাজুকে নিয়ে চিন্তা করিতে লাগিল, কিন্তু দুই বােনের চিন্তা এক
নয়, দু’বােনের চিন্তা দুই রকমের।
:-ফাতেমা চিন্তা করিতে লাগিল সাজু দুলির হইতে অনেক দূরে থাকুক,
ওদের ভালােবাসা যেন প্রেমিক প্রেমিকাতে রুপান্তরিত না হয়।
:-আকলিমা ভাবিতে লাগিল, সাজু আর দুলি যেন ওদের ভালােবাসা।
গড়ে উঠে প্রেমিক প্রেমিকাতে, ওরা দুজনে একে অপরকে ভালােবেসে
ফেলেছে, ওদের ভালােবাসা যেন জয় হয়।
:-অন্য দিকে দুলি তার ঘরে গিয়ে নানা ধরনের চিন্তা করছিল একা
একা আনমনে, তার মনে পড়ছিল তার মায়ের কথা গুলাে।|
:-এমনি সময় প্রবেশ করলাে সাজু দুলির কক্ষে।
:-দুলি এক নজর চাহিয়া দেখিয়া কহিল- সাজু ভাই, তুমি আমার ঘরে
চা নিয়ে আসলে কেন?
:- আরে তুই আমার প্রতিদিন চা খাওয়াস, আর আমি এক দিন তােকে
চা খাওয়াতে পারবাে না, এটা কথা হলাে, আমার জন্য তুই যা করতে
পারিস আমিও তায় পারি বুঝলি।
:- বুঝতে আমি সব পারি, কিন্তু সব কিছু বলতে পারি না।
:- আরে কেন বলতে পারবি না? তাের মনে যা কিছু বলতে ইচ্ছা হয়।
তায় বলবি, তাের কোন বাধা নেই কেমন, আচ্ছা চা খেয়ে পড়া শােনা
করবি আমি ঘরে গেলাম।
:- কেন আজ রাতে খাবে না?
:- না আজ রাতে খাব না, যদি পারিস কাল সকালে খাইয়ে দিবি, তার
পর যাব, মনে থাকবে তাে?
:- ভাই, আমার কোনদিন ভুল হবে না।
:- আমি জানি ভুল কোনদিন হবে না, আমি গেলাম।
শ্যামলী-৪৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- কাল কোথায় যাবে সে কথা আমার কাছে বলবে না?
:- হ তাের কাছে বলব, আমি শ্যামলীর কাছে যাব, জার্মান থেকে এসে
সবার সঙ্গে দেখা হয়েছে, শুধু শ্যামলীর সঙ্গে দেখা হয়নী, শ্যামলীর
সঙ্গে সবার আগে দেখা করার দরকার ছিল, কিন্তু পিছে পড়ে গেলাম।
:- শ্যামলী বুবু খুব ভালাে তাই না সাজু ভাই?
:- দুলি, শুধু শ্যামলী কেন, পৃথিবীর সকল মানুষই ভালাে, শ্যামলী ছােট্ট
বেলার সাথী আজ কতদিন দেখিনী! তাই দেখতে যাব, আর সকলের
সঙ্গে দেখা হয়েছে। শুধু শ্যামলীর সঙ্গে যদি দেখা না করি, তবে হইতাে।
অভিমান করে থাকবে।
:- দুলির ঠোটে হাসির মাঝে বলিল- আচ্ছা সাজু ভাই শ্যামলী যদি
অভিমান করেই থাকে, তাতে তােমার কি আসে যায়, সে অভিমান করবে
কেন, আমাকে বলতেই হবে তােমার সাজু ভাই।
:-দুলি তাের এত কিছু জানবার দরকান কি, আর কথা নাই পড়া শােনা
কর, আমি চলি, বলিয়া সাজু ঘর থেকে বাহির হইয়া চলিয়া গেলাে।
:-দুলি একা একা আবার চিন্তা করিতে লাগিল।
*****************************************
:-অন্য দিকে ফাতেমা ও আকলিমা হয়ত এতক্ষনে অনেক গল্প বলিয়া
ফেলিয়াছে।
:-আকলিমা বলিল-বুবু তবে কি আমি রিক্ত মন নিয়ে ফিরে যাবাে?
:- আমি তাের মন কি দিয়ে যে ভরিয়ে দেবাে কিছুই ভাবতে পারছিনা,
কারন আমি এক ছেলের মা, আমার একটু ভাবতে দে, সাজুর সঙ্গে কথা
বলে দেখি ও কি বলে।
:- আমারও তাে শুধু একটাই মেয়ে তােমার কাছে রেখেছি সেটা, কেন
তুমি বুঝতে চেষ্টা করছ না, আমি ছােট্ট হয়ে কোনদিন কিছু দাবি করিনী।
:- তুই যে দাবি করেছিস তাতে সব পেয়ে যাবি আর কিছুই বাকি রবে
:- বুবু আমি কি সাজুর সঙ্গে এই আলাপ করবাে?
:- না----- সাজু যদি তাের কথার জবাব না দেয়, সাজু আমার জবাব।
দেবে -- হাঁ অথবা না ----------
শ্যামলী-৪৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- সাজু যদি বলে না, আর কি কোন দিন হাঁ বলাতে পারবি? আমি
তােকে বােঝাতে পারছি না বিয়ে ভাগ্যের উপর নির্ভর করে, চল অনেক
রাত। হয়েছে, দুই বােন মিলে সােবার ঘরে চলিয়া গেলাে, গভীর রাত পেরিয়ে।
প্রভাত হয়ে আসলাে, এবার সবার ঘুম ভেঙ্গে যাবার পালা। আজানের
ধ্বনী ভেসে আসলাে, এবার নামায পড়ার সময় হলাে।
:-ফাতেমা সবার জাগিয়ে দিল, নিজে নামায পড়িয়া লইল, তার পর চা
নাস্তার কাজে গেলাে, দুলি ঐ খাবার গুলি টেবিলে রাখলাে, সবাই নাস্তা
করিয়া নিজ নিজ কাজে চলিয়া গেলাে।
*****************************************
:-শ্যামলী তার পড়ার ঘরে আসিয়া বই পড়ছিল, এমনি সময় সাজু
প্রবেশ করিল, শ্যামলী বই পড়া বন্ধ করিয়া লক্ষ করিল, এতাে পিতির
পায়ের শব্দ নয়, বুট পরা (মানুষের) পায়ের শব্দ, মনে মনে ভাবিল এই
মানুষটি কে হতে পারে, পিছনে তাকাল, দেখিতে পাইল সাজু বটে,
তখন শ্যামলীর হৃদয় খানি ভরিয়া উঠিল, মৃদু হাসিয়া শ্যামলী কহিল।
:-সাজু ভাই তুমি---------------!!! বসাে বসাে এই চেয়ারে বসাে,
কেমন ছিলে এত দিন?
:- ভালাে, খােদা পাক যে হালে রাখে সেই হালে থাকি তুমি কেমন ছিলে,
আর এখন কেমন আছ বল?
:- খােদার কাছে ভালাে, কিন্ত মানুষের কাছে মন্দ, কেউ ভালাে বাসে
আর কেউ ঘৃনা করে, আচ্ছা সাজু ভাই, পৃথিবীতে কোন কাজ করিলে
সবার কাছে ভালােবাসা পাওয়া যায়? আর নিজে ভালাে থাকা যায়, তুমি
বলতে পারকি?
:- যারা মানুষের সেবাই নিয়জিত থাকে তারা সবার কাছে ভালাে হয়,
অথবা যারা পাঠশালা তৈরি করে শিক্ষাদান করে, তারাই সমাজের সব
মানুষের কাছে ভালাে হতে পারে।
:- আজ তুমি এই দেশের এক জন ভালাে ডক্টর, মানুষের সেবা করে
সবার কাছে ভালাে হতে পারবে, কিন্ত আমি এই জগতে কিছুই করতে।
পারবাে না, কাহারাও কাছে হয়তাে বা ভালােও হতে পারবাে না।
শ্যামলী-৪৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- তােমার চিন্তা ভুল, ইচ্ছা করিলে সব কিছু পারা যায়, যদি মানষ কে
ভালাে বাসতে সাধ জাগে তবে পারবে, আর যদি মানুষ কে ভালাে
বাসতে ইচ্ছা না হয়, তবে পারবে না, থাক এ সব কথা, তােমার একটা
কথা বলব মনে করে এসেছি, একান্ত বলার
দরকার---
:- আমার সাথে কথা বলবে মনে করে এসেছ, বলাে?
:-সাজু গভীর ভাবে একটু চিন্তা করিয়া লইল তার পর বলিল থাক আজ
আর বলব না, অন্য দিন বলব।
:-আমার মতাে মানুষের সঙ্গে কেউ কথা বলতে চাইনা, এই সমাজের
মানুষের কাছে কতটুকু মুল্য আছে, আমার মত মানুষ এ জনমে তােমার
কাছে কোন দিন বসতেই পারব না। অনেক দিন পর তােমার হাতে
পেয়েছি, সহজে ছাড়ব না, এই গরীবের বাড়ী কি খাবে বলাে?
:-আজ আমি কিছুই খাব না, আবার আসবাে।
:- সে কথা আমি আগেই বলেছি, আমার মত একটা অবুলাকে সবাই
ঘৃনা করে আজ তুমি ও তাে ঘৃনা করবেই।
:- আচ্ছা কি খেতে দেবে বলাে?
:- তুমি যা খেতে চাও।
:- তুমি খুশি মনে যা খেতে দেবে আমি তাই খাব।
:- তােমার জন্য খাবার তৈরী হচ্ছে ততক্ষন আমরা কিছু গল্প করে সময়।
কাটিয়ে দিই।
:- তােমার আমি কি গল্প শুনাব বলাে।
:- জার্মান দেশের কত গল্প আছে।
:- জার্মান দেশের গল্প আজ তােমার শুনাব না। জার্মানের গল্প আরেক
দিন এসে শুনাব আজ আমাদের দেশের গল্প তােমার কাছে শুনব।
:- আমি আর কি গল্প শুনাব বলাে?
:- কেন, তােমার মনে পড়ে না, আমাদের ছােট্ট বেলার সেই যে আমের।
বাগানে, ছুটির দিনে কত কিছু করতাম।
:- সাজু তােমার কি মনে পড়ে? আমাদের সেই ছােট্ট বেলার কথা, মনে।
পড়ে এক সঙ্গে কত কিছু খেলতাম।
:- হাঁ মনে পড়ে এক দিনের কথা তােমার হাতের দান সেই দিন।
শ্যামলী-৪৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আমাদের ঘরে কোন খাবার ছিল না, একটি কাঁঠাল ভেঙ্গে দিয়েছিলে
তুমি নিজের হাতে, আমি বড়ই খুশি হয়েছিলাম, কাঠালটি আমি মথায়।
করে বাড়ী নিয়েগেলাম, সময় ছিল আষাঢ় মাস, কয়েক দিন ধরে
অনবরত বৃষ্টি।
ঝরছিল, সেই বৃষ্টি ভেজা মাথায় মায়ের সামনে দাড়ালাম, মা ছােট্ট করে
বল্লো।
:- কে দিলাে এই কাঁঠাল?
:-আমি বললাম, শ্যামলী দিয়েছে, আমার মুখে তখন হাসি, মায়ের
চোখে অশ্রুজল, আমি বললাম মা, তােমার চোখে অশ্রু কেন?
:-মা, চোখের পানি মুছিয়া কহিল- কই না তাে আমার চোখে পানি কই।
একটু নিরব থাকিয়া বলিল-ছােট্ট মেয়েটির এই দান, আমার মত
অসহায় নারী এই দান কি দিয়ে শােধ করবাে, আজো মনে পড়ে তােমার
সেই ছােট্ট বেলার কথা।
:- সাজু তােমার চোখে আজ অশ্রু ভরা জল কেন?
:- আমি জানি না শ্যামলী, অজান্তে কখন চোখে জল এসেছে।
:- তুমি বলাে আমি কি ভুল করেছি?
:- না তুমি ভুল করােনী তুমি ভুল করতে পারােনা।
:- তােমার আমার মাঝে আবার কি ফিরে আসবে আগের সেই দিন,
ফিরে আসবে কি, আগের মত ভালােবাসা------!!!!!!!!!!!
:- যেদিন চলে গেছে সেই দিন আর ফিরবে না কোনদিন, আমরা আজ
কত পথ পার হয়ে চলে এসেছি বলতে পার?
:- আমি বলতে পারব না, আমরা কত দুর চলে এসেছি, আমার মনে হয়
সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি, তুমি বলছ অনেক অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি।
:- আমি সত্যি বলছি আমরা থেমে নেই, যে প্রান্তেই ছিলাম তার অপর।
প্রান্তে চলে গেছি।
:- না, আমার মনে হয় আমারা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি।
:- আমরা কতটা পথ চলে এসেছি, ফিরে না গেলে সেই ভালাে হতাে
কিনা?
:- সাজু আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানে গেলে ভালাে হতাে, তােমার
শ্যামলী-৪৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
মনটা মেনে নিতে পারছি না।
:- আগের সেই দিন আর আজকের এই দিন অনেক দুরত্ব, যেমন তুমি।
আজ কত বড় হয়ে পড়েছ।:- আমি জানি না, বুঝতেও পারিনা, কত বড়
হয়েছি, শুধু এই টুকু জানি দুঃখের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি, আর আমি কিছুই
জানিনা বলতেও পারিনা, পুরাতন সবকিছু থাক, নতুন কিছু করতে হবে।
কি?
:- না, নতুন আর কিছু করতে হবে না, এখন তােমার দান আর নিতেও
চাইনা, আমি যে আর আগের মত নেই।
:- সাজু, আমি জানি সাময়িক মানুষের মন বদলে যায়, তুমিও আগের মত
নেই, আমার মনে হয় অনেক বদলে গেছ।
:- সাময়িক সকলেই বদলে যায়, আমিও না হয় তায় গেলাম, সারাটা
জীবন কি আর এক জনের দয়ার আশা করা যায়? আমার মত মানুষ
কাহারও দয়ার আশা করা উচিৎ নয়।
:- আমি যদি আগের মত কিছু দিবার ইচ্ছা করি, তুমি কি নিতে ইচ্ছা
করবে না?
:- তুমি কেন বুঝতে পারছ না, তােমার দেওয়া কোন কিছু আমি কেমন।
করে হাত পেতে নেবাে? আমি যে বদলে গেছি।
:- আমার দেওয়া কোন কিছু যদি তুমি হাত পেতে নাই নিতে পার, তবে
আমি আর জোর করে দিতে চাইনা, কিন্তু তুমি যখন সময় পাবে তখন
আমার সঙ্গে দেখা করে যাবে, তারই মাঝে আমার দেওয়া হয়ে যাবে।
:-শ্যামলী তুমি এই আশা আর কোনদিন করাে না, আমি যেমন তােমার
কাছে চাইতে পারবাে না, ঠিক তেমনি আসতে পারব না।
:- আমার কাছে আর কিছুই চাইবে না, দিতে গেলেও নিবে না, সাজু আমি
তােমার কাছে আগের মতই আছি।
:- তুমি যা বলছ তাই সত্য, আমার এখন উঠতে হবে, সামনে অনেক
কাজ বাকি।
:- তুমি আজ অনেক কাজের মানুষ হয়েছ, আর আমার সমস্থ কাজ শেষ।
হয়ে গেছে, মনটা আজ হতে নিরব!
:- তােমার কথা আমি মেনে নিতে পারছি না, জীবনে কোন মানুষ কি
নিরবে থাকতে পারে? কেউ যদি না থাকতে পারে, তবে আমি পারবাে
শ্যামলী-৪৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
কেন, যেমন তােমার আজ অনেক কাজ তায় তােমার মন চঞ্চল হয়ে
ওঠে, আর আমার মনটা নিরব, তাই আমি সারা জীবনের মত কাজগুলাে
অনেক দুরে রাখবাে, কিন্তু তােমার প্রথম কাজ কি?
:- আমার প্রথম কাজ মনে করতে পার দুলিকে ভালাে রকমের শিক্ষা।
দেওয়া, তারপর একটা প্রায়ভেট হাসপাতাল খােলা, আর সমাজ সেবা
করা।
:- আমি দোয়া করবাে তােমার আশা পূর্ণ হােক, খােদা পাক তােমার।
সহায় হােক।
:-অনেক সময় দু’জন নিরব রইল তারপর সাজু বলিল-তােমার জন্য
আমার কাছে দোয়া চাইবে না------
হাঁ হাঁ করিয়া হাসিয়া উঠিল শ্যামলী, হাসির মাঝে ছিলাে দুঃখের
আভাস, কিন্তু সাজু সবি উপলদ্ধি করিতে পারিল, সাজু কি বলিবে তখন।
কিছুই আর ভাবিতে পারিতে ছিলনা, তবুও বলিল- তােমার মন আমি
ভালােবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারব না।
:- সাজু, তুমি অনেক দিন পর আমায় আজ হাসালে, আমার জন্য দোয়া
করাে আমি যেন আগের মত থাকতে পারি, আমি যেন কোন পরিবর্তন।
হতে না পারি এই দোয়া পেলেই সুখি হতে পারব, আর তােমার কাছে কি
বা চাইব, যেটুকু চেয়েছিলাম সেই টুকু হয়তাে বা এতদিনে হারিয়ে
ফেলেছি, মনের অজান্তে যাহা হারিয়ে যায়, তাহা আর শেষে খুজিয়া
পাওয়া যায় না---------
:- এমন কি তুমি হারিয়ে ফেলেছ, যেটা আমার কাছে বলা যাবে না?
:- আমি যা হারিয়ে ফেলেছি সে তাে চিরদিনের মত হারিয়েছি, তােমার
কাছে বলেই বা লাভ কি বল?
:- একবার চেষ্টা করে দেখি।
:- চেষ্টা করে আর কোন লাভ হবে না, তার চেয়ে নিরব থাকাই আমি
ভালাে মনে করি।
:- শ্যামলী তােমার মনের কথাটা আমি বুঝতে পারলাম না, তুমি কি
বলতে চাইছ বলাে?
:- থাক, আজ নয় অন্যদিন বলব, ঐ তাে পিতি খাবার নিয়ে এসেছে
আমাদের গল্প শেষ করাই ভালাে।
শ্যামলী-৫০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- না আমাদের গল্প এখনও অনেক বাকি, তােমার বাড়ীতে এসে, খাইনী
বলতে পার।
:- না, আমি বলতে পারব না, আমি চাইনা তােমার উপকার করে সেই
উপকারের কথা মনে করে দিতে, যা কিছু করেছি আমার নিজের ইচ্ছা মত।
করেছি, এখন থেকে তােমার মনে যা বলে তায় করতে পার। তােমার
মতের বিপরিত কিছুই করতে চাইনা, আমার একটা কথা বলতে বার
বার ইচ্ছা হচ্ছে, তুমি যতটা মনে রাখতে পার আমি পারি না।
:- তােমার স্বরন শক্তি কি কমে গেছে?
:- হয়তাে বা তাই হবে------------!
:- তা হতে পারে না, তােমার সেই বয়স এখনও হয়নী, আমার মনে হয়
তুমি অভিনয় করছ।
:- অভিনয়, সে তাে যারা নাটক করে তারাই অভিনয় করে, আমি তাে
নাটক করিনী কোনদিন, কেমন করে অভিনয় করতে হয় তাও জানি না।
:- শ্যামলী, হয় তাে তােমার কাছে আমি হেরে যাচ্ছি।
:- সাজু, তা তুমি হারছ না, হারছি আমি, তুমি আর আগের মত নেই, তুমি
যে বর্তমান------------------!!!
:- আমি তােমার কি দিয়ে ভালােবাসব বলতে পার?
:- আমি বলতে পারব না থাক এসব কথা।
:- আমি যেটা সত্য সেটাই বলব তুমি কি শুনবে?
:- তােমার সব কথায় শুনবাে, কিন্তু আজ নয় অন্যদিন, আজ তুমি
যেখানে, আমি সেখানে নেই, তুমি কতদুর উচুতে আছ তাও কল্পনা করতে
পারবনা, সেই জন্যে তুমি আজ বর্তমান, গত কালের মত আর নেই।
:- আমি যদি অতীত পার হয়ে আসতে পারি বর্তমানে, তুমি কি বর্তমানে
ফিরে আসতে পারবে না?
:- সাজু তােমার কি দিয়ে বুঝাব, আমার মাথায় তেমন বুদ্ধি আসছে না,
তােমার কথার কি জবাব দেব বলাে!
:- আমার কথার জবাব যদি তুমি নাই দিতে পার তবে আজ আমি চলি
সময় করে আবার আসবাে।
:- আবার কবে, কতদিন পর আসবে?
:- বললাম তাে যখন দরকার
শ্যামলী-৫১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
তখনই আসবাে, কথা গুলাে বলে সাজু চলিয়া গেলাে, জমা কথা গুলাে
কেউ কাহারাও সঙ্গে কহিতে পারিল না, একা একা নিজের সঙ্গে নিজের
প্রশ্ন করিতে লাগিল।
:-শ্যামলী ভাবছে, দুলিকে সাজু বিয়ে করবে, এজন্য হয়তাে আমায়
এড়িয়ে চলছে, কথার মাঝে বােঝা যায়, আমার এই হৃদয়ের মাঝে সাজুর
স্থান দিয়েছি, তবে কি আমি ভুল করেছি! সাজুকে কেমন করে দুরে রাখব,
ছােট্ট বেলায় সাজু ছিলাে আমার খেলার সাথী, দিনে দিনে আজ দু’জনাই
বড় হয়েছি, এই সময়ের মধ্যে কত ভালােবেসে ফেলেছি, না জেনে না
শুনে কেন এতখানি ভালােবাসলাম! আমি যার এই মন দিলাম, তার মন।
আমি পেলাম না! দু’চোখ বেয়ে পানির ঢল নামিয়া আসিল!!
:-এমন সময় পিতি আসিয়া কহিল- বুবুজান তােমার ডাকছে, আহম্মদ
উকিল, বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে।
:- কাছারি ঘরে বসতে বল আমি একটু পরে দেখা করবাে।
:-পিতি বহিরে আসিয়া রাগে রাগে কহিল- লােকটা কেন যে আসে কিছু
বুঝি না, কথা গুলাে কেহই শুনিতে পারিল না, বাড়ির বাহিরে আসিয়া
বলিল- আসুন বুবু জান কাছারী ঘরে বসতে বললাে, আসতে একটু দেরী
হবে, যান যতক্ষন না আসে ততক্ষন চুপ করে বসেন, মনে থাকবে তাে
যান ঐ খানে বসুন।
:-আহম্মদ কহিল- খুব জরুরী দরকার।
:- বুবুজান কার জরুরী কাজে তাড়াতাড়ী করেন না, আমি যা বললাম
আপনি তাই করুন, মনে থাকবে তাে? বলিয়া পিতি ভিতরে চলিয়া।
গেলাে।
:-কিছুক্ষন পর শ্যামলী আসিয়া কহিল- আহম্মদ ভাই তুমি কি মনে করে
এসেছ?
:- তােমার আপন বলতে কেউ আছে বলে মনে হয় না, তাই একটা কথা
নিয়ে এসেছি, যদি রাজি হতে পারাে তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি, তুমি
রাজি হলে ভালােই হবে।
:- কথাটা কি খুলে বলাে?
:- তােমার বিয়ের একটা সুখবর নিয়ে এসেছি।
শ্যামলী-৫২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- বিয়ের খবর, ভালাে, তা ছেলেটি কি করে?
:- আইন ব্যাবসা।
:- আইন ব্যাবসা করে খুব ভালাে, আমার সময় হলে তােমার খবর দেব
বর্তমান আমি মানুষিক চিন্তায় আছি, আর যদি কিছু বলার থাকে বলতে
পারাে।
:- আর একটা কথা বলার আছে।
:- বলাে কি বলবে?
:- কোটের সামনে জমিটা আমি নিতে চাচ্ছি।
:- কে বলেছে জমি বিক্রি করবাে।
:- আমি শুনেছি বলেই তাে এসেছি।
:- আমি কাহারাও কাছে বিক্রয় করতে চাইনী, একটা কথা মনে রেখ,
আমার বাবার যা কিছু আছে, যেমন আছে সবি চিরদিন তেমনই থাকবে,
বুঝেছ? তুমি আমার কাছে কোনদিন না আসলেও চলবে, এবার যেতে
পার।
:- শ্যামলী তুমি আমার অপমান করছাে?
:- না, আমি তােমার অপমান করতে চাইনী, তােমার হৃদয় অপমানি হতে
চেয়েছে আমার কাছে।
:- তুমি একটা নারী আর আমি একটা পুরুষ, জান তােমার কি করতে
পারি?
:- জানি তুমি যেটা করতে পার আমি সেটা পারি না, আমি নারী আর তুমি
পুরুষ, তায় তুমি সব কিছু করতে পার, এবার তুমি যেতে পার।
:- আজ আমি গেলাম প্রয়ােজনে আবার আসবাে, অহম্মদ রাগে রাগে
চলিয়া গেলাে, একটু পর নাসির খা আসিল, আহম্মদ যখন যায় তখন
নাসির খায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিন্তু কোন কথা হয়েছিল না।
:-নাসির খা শ্যামলীর সামনে দাঁড়াইয়া কহিল-শ্যামলী ঐ আহম্মদ উকিল।
কেন এসেছিল মা? ওরা উকিল মানুষ কখন কি করে বসে বলা যায় না।
:- আহম্মদ এসেছিল আমার বিয়ের বার্তা নিয়ে।
:- তুমি তার কি জবাব দিলে বলাে তাে মা?
:- আমি হয়তাে বড় ভুল করেছি চাচা ।
শ্যামলী-৫৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- তুমি তাে ভুল করতে পার না, বলাে কি বলেছে?
:- আমি বলেছি আমার এই বাড়ীতে আর কোনদিন আসবে না।
:- ঠিক বলেছ মা, যার বাবা ভালাে ছিল না, তার সন্তান কোনদিন ভালাে।
হতে পারে না, ওর বাবা আর তােমার বাবা দু’জনার মনের মিল কোনদিন
ছিল না, তােমার বাবা ছিল অতি সৎ মানুষ, তায় অসৎ মানুষের সঙ্গে
কোনদিনই মিশতে দেখিনী, তােমার ভিতরে আমি যেন তায় দেখি,
তােমার বাবার সম্মান রেখ।
:- তুমি দোয়া করাে চাচা, আমি যেন আমার বাবার উজ্জল মুখ রেখে
যেতে পারি, আর কিছুই চাইনা।
:- আমি যতদিন বেচে থাকব ততদিন তােমার জন্য দোয়া করবাে, তুমি
তােমার বাবার মত সুনাম যেন রেখে যেতে পার, কিন্তু মা, তুমি যেন
কখনও খারাপ লােকের সঙ্গে মিসবে না, যেমন তােমার বাবা মন্দ লােকের
ধারে কাছে সদা সর্বদা যেত না, পারবে তুমি এমন করে, যেমন তােমার
বাবা এই সমাজের কল্যাণ করে গেছে?
:- যেমন করেই হােক পারতেই হবে আমার।
:-আমি প্রান খুলে তােমার জন্য দোয়া করবাে, আমি আরাে দোয়া করবাে,
তুমি সবার কাছে সুনামের প্রাত্রী হয়ে সারাজীবন যেন নদীর মত বয়ে
যেতে পার, ঐ যে এসেছিল একটু আগে ধুকাবাজির ছেলে ধুকা বাজ, মনে
রেখ আর কোনদিন যেন না আসে, এমনি করে আসা যাওয়া করতে
করতে সাগরের মাঝখানে ছুড়ে দেবে, তখন তুমি আর কোন কুল কিনারা
পাবে না এই আমার শেষ কথা, এর চেয়ে আর বেশী বলতে পারব না,
আজ চলি মা।
:- মায়ের হাতে কিছু খাবেনা আজ?
:- না মা, আজ আর কিছু খাব না। আমি আবার আসব, বেশ কিছুদিন গত
হয়ে গেল আসতে পারিনী, একটা কথা মনে করে এসেছিলাম আজ আর
বলা হলাে না, অন্য আরেক দিন এসে বলে যাব, তুমি আজ আর খেতে।
বলাে না মা, আমি আবার আসবাে, কথা গুলাে বলিয়া চলিয়া গেলাে
নাসির খা।
:-শ্যামলী দুই তলায় উঠিয়া, পিতা ও মাতার ছবির দিকে এক নজওে
অপলােক দৃষ্টিতে চেয়েছিল।
শ্যামলী-৫৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
এমনি সময় ফাতেমা আসিয়া শ্যামলীর পাসে দাঁড়াইল, দেখিতে পাইল
শ্যামলীর চোখে অশ্রু ঝরছে, কিন্তু কেন, তাহা বুঝিতে পারিল না
ফাতেমা, কিছুই ভবিতে না পারিয়া ফাতেমা কহিল- শ্যামলী তুমি কাঁদছ
কেন?
-চোখে জল মুছিয়া শ্যামলী কহিল- তুমি কখন এসেছ খালা?
:- তুমি কাদছ কেন জানতে চাইলাম?
:-কেঁদে আর কি হবে, যারা চলে গেছে আর ফিরবে না, ফাতেমা চোখের
জল মুছিয়া দিয়ে বলিল- শ্যামলী।
:- ছােট্ট করিয়া উত্তর নিলাে শ্যামলী- হু।
:- তােমার কাছে কি সাজু এসেছিলাে?
:-ঐ কথা শুনিয়া শ্যামলীর চোখের পানিতে বুক বেয়ে বহতা নদীর মত
অশ্রুজল ঝরতে ছিলাে, মুখে আর কোন কথা নেই, ঠোট শুধু কাঁপছে।
:-শ্যামলী তুমি কথা বলছ না কেন? তােমার চোখে জল, সত্য কথা বলাে
তােমার কাছে কি সাজু এসেছিল?
:- হাঁ এসেছিল, কিছুক্ষন আগে চলে গেছে।
:- সাজুর মনের কথা নিশ্চয় তােমার কাছে বলে গেছে?
:- না খালা আমার কাছে এমন কিছুই বলিনী।
:- তােমার মনের কথা সাজুর কাছে হয়তাে বলেছ?
:- খালা, তুমি কি বলতে চাইছ আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না, সাজু
ভাই আমার কাছে কি বা বলতে পারে, আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি
না
। :- তুমি এখন অনেক বড় হয়েছ, কিছুই ভাবতে পার না, আর কতদিন
পরে মানে আর কত বছর পর ভাবতে পারবে, মেয়েরা শুধু চোখের জল
ফেলতে পারে, আর কিছুই বলতে পারেনা, আর কিছুই করতেও পারে না,
তুমি জান কোন জিনিষটা আমার এই হাতের মুঠো থেকে অনেক দুরে চলে
যাচ্ছে, তােমার নিজ জ্ঞানে ভাববার দরকার---
:- আমি কিছুই বলতে পারব না খালা, যদি কিছু ভুল হয়ে যায় তবে ক্ষমা
করে দাও, আমি তাে তােমার মেয়ের মতই, যদি আমার মত তােমার
একটা মেয়ে থাকতাে, তবে কি ক্ষমা না দিয়ে পারতে, যদি সামান্য হােক
আর বড়ই হােক ভুল করেই থাকি, তুমি মায়ের মত করে ।
শ্যামলী-৫৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ক্ষমা করে দাও, হয়তাে অপরাধ করেছি আমি, চাইনা তােমার মনে দুঃখ
দিতে, ছােট্ট
বেলায় মা হারিয়ে তােমাকে মায়ের রুপে দেখেছিলাম, তুমি মায়ের মত
আদর, মায়া-মমতা ভালােবাসা, সবিই তােমার মাঝে পেয়েছিলাম। আমি
তােমার কোনদিন দুঃখ দিতে পারবাে না, আমার জীবনের বিনিময়ে
তােমার শান্তি দিতে চায়, খালা, তােমার চোখে জল, আমি কত কষ্ট পাচ্ছি
তুমি কি কিছুই বুঝতে পারছ না?
:- তােমার জন্য আমি আজ কত কষ্ট পাচ্ছি তা কি তুমি কিছুই বুঝতে
পারনী, সবিই কি তােমার বুঝিয়ে দিতে হবে, তুমি কি নিজে কোন দিন
বুঝতে পারবে না, তুমি কি আগের মত কচি খুকি আছাে, তােমার মনের
মানুষ কে হবে, তাকে আজো কেন চিনে নিতে পারছ না? সত্য কথাটা
বলাে আমি বড় খুশি হবাে।
:- আমি কোন কথা বললে তুমি খুশি হবে?
:- আমি জানি তুমি কিছুই বলবে না, তােমার মন বলছে বলি, কিন্তু বলতে
পারছ না, আমিও জোর করে শুনতে চাইনা, আবার আসব, আজ চলে
গেলাম মা, আর কোন কথা না বলিয়া চলিয়া গেল ফাতেমা।
:-শ্যামলী শুন্য হৃদয় নিয়ে একাই ঘরের ভিতর ডুকরিয়ে কাঁদিতে লাগিল,
কোন কিছুই ভাবিতে পারিতে ছিল না সে।
:- ঘন্টা খানেক পর দুলি আসিয়া সােজা ঘরের ভিতরে গিয়া শ্যামলীকে
ডাকিয়া কহিল-বুবু, তােমার চোখে জল?.....
:-চোখ মুছিয়া শ্যামলী উত্তর দিল-না না আমার চোখে জল কই, আমি
কাঁদব কেন?
:-বুবু আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা, সত্য যাহা, তাহা আমার কাছে
লুকাচ্ছাে কেন?
:-বিশ্বাস কর আমি কিছুই লুকোচুরি করছি না।
:-সব কথা থাক, তােমার কাছে খালা এসেছিল?
:-হ্যা এসেছিল।
:-এসে ছিল, ভালাে কিন্তু কোন ধরনের কথা বলে গেল?
:-খালা যে কথা বলে গেলাে, সেই কথা আমি চিন্তা করে না বুঝে তােমার
কাছে কোন দিন বলতে পারবাে না।
শ্যামলী-৫৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-কেন বলতে পারবে না, আমার কাছে বলতেই হবে, যত দিন না বলবে
তত দিন এই খানেই থাকব।
:-দুলি, আমার মুখে ঐ একই কথা, আমি কিছুতেই বলতে পারবাে না,
কিছুতেই না।
:-শ্যামলী বুবু, তুমি যদি সত্য কথা না বলতে পারাে, তবে আমি যে
কতখানি দুঃখ পাবাে তা তুমি বুঝতে পারবে না, আর আমি তােমার
বুঝাতে পারবাে না, মা এসেছে আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, সাজু
ভাই ও মায়ের এতক্ষনে গুছানাে হয়ে গেলাে, তােমার কাছে এসে আমার।
অনেক দেরি হয়ে গেলাে, আমরা তিন জন একই সঙ্গে যাবাে, ফিরার
সময় সাজু ভাই আর আমি এক সঙ্গে ফিরে আসবাে।
:-তােমার সামনে পরীক্ষা তবুও কি যাবে?
:-যেতে আমার হবেই, তা ছাড়া আমার আর কোনাে পথ নেই, কিন্তু
তােমাদের সত্য কথাটা শুনতে পারলে খুশি হতাম।
:-সত্য মিথ্যা আমি কিছুই বলতে পারবাে না।
:-সত্য মিথ্যা কিছুই যদি নাই বলতে পারাে, তবে আমি চলি, আবার
আসবাে, কথা গুলাে বলিয়া চলিয়া গেল দুলি।
:-ঐ খানে দাঁড়িয়ে শ্যামলী গভীর ভাবে চিন্তা করছিল, ভাবছিল-সাজুর
অবহেলার কথা, ভাবছিল-আহম্মেদ কি কি কথা বলে গেলাে, ভাবছিল
ফাতেমার কথা, সত্য কথা কি বলতে হবে, ভাবছিল-দুলি কোন কথার
জবাব নিতে এসেছিল, এই সময় শ্যামলীর পৃথিবী যেন এলাে মেলাে।
হয়ে যাচ্ছে! শ্যামলী শুধু ভাবছে সাজু এমন কথা গুলাে কেন বলে
গেলাে, যেদিন চলে গেছে সেই দিন আর ফিরে আসবে না, আমরা আজ
কতটা পথ পার হয়ে এসেছি বলতে পার? আমি সত্যি কথা বলছি আমরা
থেমে নেই, যে প্রান্তে ছিলাম তার অপর প্রান্তে চলে এসেছি, আমরা
যথটা পথ চলে এসেছি, ফিরে না গেলে সেই ভালাে হতাে কি না?
আগের সেই দিন আর আজকের এই দিনের অনেক দুরুত্ব! যেমন আজ
তুমি অনেক বড় হয়েছ, তুমি কেন বুঝতে পারছ না, তােমার দান আমি
কেমন করে হাত
পেতে নেবাে, আমার প্রথম কাজ মনে করতে পারাে দুলিকে ভালাে
রকমের শিক্ষা দেওয়া, একটা হাসপাতাল খােলা, তার পর সমাজ।
শ্যামলী-৫৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
সেবার কাজে চলে যাওয়া, এতক্ষন ভাবছিল সাজুর কথা, শ্যামলী আরাে
ভাবছিল, আহম্মেদ কি কারণে ঐ রূপ কথা কেন বলে গেল, তােমার আপন
বলতে কেউ আছে বলে মনে হয় না, তাই একটা কথা মনে করে এসেছি, যদি
রাজি হতেপার তবে বলতে পারি, আর একটা কথা বলার আছে, শহরের
জমিটা যদি বিক্রয় করতে তবে আমি নিজেই নিতাম, তুমি একটা নারী আর
আমি একটা পুরুষ, জান আমি তােমার কি করতে পারি, আজ গেলাম আবার
আসবাে, তার পর নাসির খানের কথা গুলাে সবই মনে পড়িল, শ্যামলী ঐ
আহম্মেদ উকিল কেন এসেছিলাে, ওরা উকিল মানুষ কখন কি করে বসে
কিছুই জানা যায় না, তুমি কি বলেছাে যার বাবা ভালাে ছিল না তার ছেলে
ভালাে হতে পারে না, তার পর মনে পড়িয়া গেল ফাতেমার কথা, সাজুর
মনের কথা নিশ্চয় তােমার কাছে বলে গেছে, তােমার কাছথেকে আমি আজ
কত কষ্ট পাচ্ছি তা কি তুমি কিছুই বুঝতে পারনি, সবই কি তােমায় বুঝিয়ে
দিতে হবে, তুমি কি নিজে কোন দিন বুঝতে পারবে না, তুমি কি আগের মত
আজো কচি খুকি আছাে, তােমার মনের মানুষ কে হবে তাকে কেন চিনে নিতে
পার নি, সত্য কথাটা বলাে, আমি বড়াে খুশি হবাে, আমি জানি তুমি কিছুই
বলবে না, তােমার মন বলছে বলি, কিন্তু বলতে পারছাে না, আমিও জোর
করে শুনতে চাইনা, আবার আসবাে আজ চলে গেলাম মা, এরপর দুলি কোন
কথা বলে গেলাে, কেন বলতে পারবেনা আমার কাছে, বলতেই হবে নতুবা
এখান থেকে সহজে যাব না, শ্যামলী তুমি যদি কথা না বলাে, তবে আমি যে
কতখানি দুঃখ পাব তা তুমি বুঝতে পারবে না, আমিও বুঝাতে পারবাে না,
যেতে আমার হবেই, তা ছাড়া আর কোন পথ নেই, কিন্তু তােমাদের সত্য
কথাটা শুনতে পারলে সুখি হতাম, সত্য মিথ্যা যদি কিছু নাই বলতে পার,
তবে আমি চলে গেলাম, আবার আসবাে..................
শ্যামলীর নয়ন ভরা জল, আর বুক ভরা আর্তনাদ, এই সময় শ্যামলীর অন্তর
বার বার বলছিল এখন আমার মৃত্যু হওয়া ভালাে, মনে করছিল পৃথিবীর কোন
কিছু আর ভালাে লাগছিল না, নিরুপায় হয়ে চেয়ারে বসে
টেবিলে মাথা রেখে কিছুক্ষন নিরব থেকে মাথা উচু করে।
...................ভাবছিল..................
********************************************
শ্যামলী-৫৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-পর দিন সকাল বেলা নাস্তার টেবিলে বসিয়া, আকলিমা কতিল-ববু
আজই নয়টার ট্রেনে আমরা সবাই যেতে চাচ্ছি।
:-ফাতেমা কিছুক্ষন নিরব থাকিয়া কহিল-কয়েক দিন পর গেলে সেই
ভালাে হতাে।
:-আকলিমা একটু রাগ করিয়া কহিল-বুবু তােমার মুখে ঐ একই কথা,
আর গেলাে না, সাজু আমার সঙ্গে গেলে কি আর অমঙ্গল হবে নাকি?
কত দিন পর বাড়ী আসলাে, আমার বাড়ী যাবে না তবে আর কার বাড়ী
যাবে? তা ছাড়া সাজুর আপন বলতে কেউ আছে নাকি? আমার সঙ্গে
যাবে আর দুলির সঙ্গে ফিরে আসবে, আমি তাে বেশী দিন থাকতে দেব
না, সামনে দুলির পরীক্ষা কয়টা দিন থেকে চলে আসবে, দুলি আমার
সঙ্গে যেতে চাচ্ছে, তায় সাজুকে সঙ্গে নিয়ে গেলে, দুলির আসার কোন
অসুবিধা হবে না, আমি মাত্র দুই দিন রাখব, ওরা থাকতে চাইলেও
থাকতে দেব না।
-হাসি মুখে সাজু বলিল-মা, তুমি আর অমত করাে না, খালা যখন বার
বার যাবার জন্য অনুরােধ করছে, না গেলে রাগ করবে, কয়েক দিন পর
যেতাম, আজই না হয় যায়, আগামি কাল থেকে পরশু ফিরে আসবাে।
:-সাজুর মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া ফাতেমা বলিল- সাজু, আমি তাের
মনের বিরুদ্ধে কোন দিন কিছু বলিনি, আর কোন দিন বলবাে না, তাের
খালার সঙ্গে যাবি তাতে আমার অমত থাকবে কেন?
:-হাঁসি ঠোটে আকলিমা কহিল-এই তাে বুবু রাজি হয়ে গেছে, চলাে
আর কোনাে ভয় নেই, দুলি তুই আবার দেরি করছিস কেন?
:-দুলি মনটা খুন্ন করিয়া বলিল—আমার সামনে পরীক্ষা, ছুটা ছুটি করলে
পড়া শােনার ক্ষতি হবে, তার চেয়ে না যাওয়া ভালাে, আমি না হয়
পরীক্ষার পর খালার সঙ্গে যাবাে।
:-রাগে রাগে আকলিমা আবার কহিল-দুলি, আমি কিসের জন্য
আসলাম, সাজুকে নিয়ে যাব তার সঙ্গে তুই যাবি, আমি তােদের তাড়া
তাড়ি পাঠিয়ে দেব, পাঁচটা দিন ধরে রাখব না, কত দিন একই সঙ্গে
তােদের কাছে ।
বসিনী, মনে করলাম তােদর নিয়ে কিছু দিন নিজের বাসায় দিন কাটাব,
তাের আব্বা তাে কোথাও যেতে পারে না, বা কোথাও যেতে দেখি না,
শ্যামলী-৫৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
তার নিজের কাজে নিজে ব্যাস্ত, তায় আমি নিজেই আসলাম, এখন
তুই যেতে পারবি না, বুবুকে তাে রাজি করলাম এবার দেখছি মেয়ে
অরাজি, তবে তােরা কি সবাই মিলে আমার পাগল করবি?
:-আকলিমার মুখের কথা কাড়িয়া নিয়া ফাতেমা কহিল- তােরা আর
তর্ক করিস না, কয়েক দিন বেড়িয়ে আয় তার পর আমি না হয় পরে।
যাবাে। দুলি আমি বলছি তাের মায়ের সঙ্গে কয়েক দিন থেকে আয়,
সাজু সঙ্গে যাচ্ছে আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসবে, যাও মা আর অমত
করাে না।
:-একটু খানি চুপ থাকিয়া দুলি কহিল-এই কয়টা দিন খালা কি একা
থাকতে পারবে?
:-আমি থাকতে পারবাে, তােমরা যাও, তােমরা যে কয় দিন না আসবে
সে কয়দিন আমি শ্যামলীর কাছে গিয়ে সময় কাটিয়ে আসবাে।
:-সেই ভালাে হবে, শ্যামলী বুবু খুব ভালাে মানুষ।
:-হাসি মুখে আকলিমা বলিল-বুবু জান আমি তাে চলে যাচ্ছি, কিন্তু যে
কথা বলে গেলাম তােমার যেন মনে থাকে আমি আবার আসবাে,
কলিমা, দুলি ও সাজু গােছ গাছ করিয়া লইল।
ছুক্ষন পর ওরা তিন জন চলিয়া গেলাে।
বাড়ীতে একা ফাতেমা রইল, বাড়ীতে কেউ না থাকায় ফাতেমার
মনে নানা ধরনের চিন্তা করিতে লাগিল-নিজের সঙ্গে নিজে কহিতে
লাগিলাে- পৃথিবী যেন আমার আজ কেমন এলাে মেলাে হয়ে যাচ্ছে,
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, সকল আশা আজ যেন কেমন বিপরীত
হয়ে যাচ্ছে। কিছুই ভাবতে পারছি না, সব মানুষের সকল আশা খােদা।
পাক পূরণ করে না, এই মনে হয় বিধাতার নিয়ম, মানুষের করণীয়।
কিছুই নেই, আমরা যত কিছু ভাবি সবই আশায়, এমনি সময় ঘরের
ভিতরে প্রবেশ করলাে শ্যামলী, দু’জনা সামনে সামনে দাড়িয়ে কেহই
যেন আগে কিছু বলিতে পারিতেছে না।
:-ছােট্ট করে শ্যামলী বলিল-খালা তােমার চোখে জল?
:-শ্যামলী এ অশ্রু জল কেন বলতে পার?
:-না আমি জানি না...
:-এ আমার হৃদয়ের চাপা কান্নার অশ্রু জল, যে হৃদয় দিয়ে তােমার।
শ্যামলী-৬০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ভালাে বাসি। এ সেই অশ্রু জল, আমার চোখের সামনে এসেচ অশ্রু
দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায়, তােমার কাছে কেন গিয়েছিলাম, মখের কখ
দিয়ে আর বুঝাতে যাব না, চোখের পানি দিয়ে যদি পারি বুঝাতে তখন
আমি ধন্য হবাে।
:-শ্যামলী ফাতেমার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললাে-খালা, বিধাতা
আমার ভাগ্য লিপিতে যা লিখেছেন তায় হবে, জোর করে কিছুই করতে
পারবাে না, পৃথিবীতে সবার ভাই বােন আছে, আমার যে কেউ নেই
! আমি যে একা, হয়তাে সারা জীবন একাই থাকবাে, তােমার কাছে।
এসেছি ক্ষমা চাইতে, হয়তাে কবে কখন বড় অপরাধ করেছি, তাই আজ
তােমার দোয়ারে এসেছি ক্ষমা চাইতে আর কিছু চাইব না! সেই ছােট্ট
বেলাই মা হারিয়েছি, তুমি মায়ের মত আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছিলে তায়।
আজ আমি এত বড় হতে পেরেছি, ক্ষনিকের অপরাধ ক্ষমা চায়-
------আর আমি কিছুই চাইনা------
না শ্যামলী, তুমি আমার কাছে কোনদিন অপরাধ করনী তােমার ক্ষমা
চাইতে হবে না, সন্তান যে মায়ের কাছে অপরাধ করেই থাকে, মা
কোনদিন সন্তানের সাথে অন্যায় করে না। - শ্যামলী, তুমিই আমার মা,
আর আমি তােমার মেয়ে, তুমি আমার মা হয়ে, মেয়ের ক্ষমা করে দাও।
:- তাই যদি হয় আমি তােমার ক্ষমা করে দিলাম।
:-খালা,---------আমি তােমার কাছে আর কোনদিন কিছুই চাইব না,
যতটুকু পেয়েছি অনেক পেয়েছি, তােমার অজান্তে অনেক কিছু নিয়েছি,
দিতে মন চাইনা, তবুও ফিরিয়ে দিতে বাধ্য তুমি প্রাণ খুলে দাবি করতে
পার, আমি তােমার হৃদয়কে ফেরত দেব না।
:-আমার কাছ থেকে অজান্তে এমন কি জিনিস নিয়েছ, তােমার মন দিতে
চাইনা, সে কোন জিনিস? আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না, আমার
এক বার বুঝিয়ে বলাে।
:-কথাগুলাে শুনিয়া শ্যামলীর চোখে জল আসিল তখন কোন কথাই
বলিতে পারিতেছে না।
:-শ্যামলী তােমার চোখে অশ্রু জল.......
:- খালা, অশ্রু জলই হয়তাে আমার জীবনের চীর সাথী হয়ে থাকবে,
শ্যামলী-৬১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
যদি ফিরিয়ে দিই তােমার কাছ থেকে নেওয়া সেই জিনিসটা,.....
:-তুমি বলাে সে কোন জিনিসটা?
:-আমি বলতে পারব না, আমি কিছুতেই বলতে পারব না, তখন
শ্যামলীর চোখে বিন্দু বিন্দু পানি ঝরছিল।
:-ফাতেমা, শ্যামলীর সামনে এগিয়ে আসলাে, নিজের আচঁল দিয়ে
চোখের পানি মুছিয়ে দিল, বড় আশা দিয়ে বললাে ফাতেমা- আমার
অজান্তে তুমি যে জিনিসটা নিয়েছ তা আর ফেরত দিতে হবে না, কিন্তু
আমার সামনে আর কোনদিন কাদবে না তাে? কথা দাও কাদঁবে না!
:- খালা বিনা দুঃখে পৃথিবীর কোন মানুষের চোখে পানি আসে না, খুশির
সময় কেহ চোখের জল ফেলতে পারে না। আমি আজ বড় ব্যাথা পাচ্ছি
তায় তাে আমার চোখে এত জল, খালা, আমি তােমার বােঝতে পারব
, ফাতেমার বুকে মাথা রেখে কেদে উঠল শ্যামলী, একবার বলাে
তােমার দুঃখ কিসে?
:- আমি একবার বলেছি আর কোনদিন বলতে পারব না, যে পাওয়া
হারিয়ে যাবে তা প্রকাশ না করাই ভাল।
:- আমি তােকে হারাতে দেব না, যদি জীবনের বিনিময়ে হয়, তবুও
জীবন বাধ্য শুধু তােমার জন্য।
:- আমি সারাজীবন একা থাকতে চাই।
:- সারা জীবন একা থাকবি এই তাের সাধনা?
:- তা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।
:- তাের ব্যাথা আমাকে এবার বুঝিয়ে বল? তাের শান্তির জন্য আমি সব।
কিছু করতে পারব। একবার আমার কাছে খুলে বল, আমি তাের মা
নাহলেও, মেয়ের মত দেখি, মা হয়ে মেয়েকে কখনও দুঃখ দিতে চাইনা,
তুই দুঃখ পেলে আমিও দুঃখ পাব।
:- খালা, আমি যা চাইব, তুমি তা দিতে পারবে না, দিতে গেলেও দেবার
সময় বড়ই কষ্ট পাবে, তাই আমার চাওয়া যদি না চায়, তবে সারা।
জীবনের জন্য অমর হয়ে থকবে, অমর হয়ে থাকা আমার পাওয়া।
:- আমার কাছে চাইলে দিতে পারবাে আমি কথা দিচ্ছি তুই চা
আমি তাই দেবাে।
:- তােমার ভালােবাসা আমার কাছে সারা জীবন অমর হয়ে থাকবে,
শ্যামলী-৬২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
চেয়ে আর কি চাইতে পারি, তুমি দোয়া করাে আমি যেন আমার মনের।
বিশ্বাস রক্ষা করতে পারি, এর চেয়ে বড় আর কিছু চাইনা, আজ চলি।
খালা।
: - না আজ তােকে যেতে দেবাে না, আমার কাছেই থাকবি।
:-সাজু আর দুলি ওরা কবে আসবে?
:- জানি না ওরা কবে আসবে।
:-একটু ভাবিয়া নিলাে তারপর শ্যামলী কহিল- খালা, আমার সামনে যে
পরিক্ষা।
:- দরকার যদি হয় তবে বই গুলাে আমি নিয়ে আসবাে, বাড়ীতে যে
কেউ নেই খালা।
:- তবে চল আমি তােদের বাড়ীতে গিয়ে থাকবাে।
:- তবে তােমার ঘরে সন্ধ্যার আলাে দেবে কে?
:- আমার ঘরে সন্ধ্যার আলাে কে দেবে জানি না।
:- প্রতিদিন দুলি সন্ধ্যার আলাে দিতাে, আজ তাে দুলি বাড়ীতে নেই,
আলাে না দিলে যে অন্ধকারে থাকবে।
:- যেদিন তারা বাড়ী আসবে, সেই দিন এ ঘরে আলাে দেবে।
:- যদি কিছুদিন ওরা খালার কাছে থাকে?
:- সেইদিন গুলাে হয়তাে বা ঘরে আলাে জ্বলবে না, এই বাড়ী না হয়।
অন্ধকার হয়ে থাকবে।
:- খালা আমি পেয়ে গেছি যা চেয়েছিলাম।
:- কি চেয়ে ছিলি আর কি পেয়ে গেলী।
:- তােমার ভালােবাসা---------আমি এই টুকু আশা করে ছিলাম, আমি
যা পেয়েছি তা যেন আর হারাইতে না হয়, এবার আমার চাওয়া পাওয়ার
আর
বাকি রইল না, আমি এখন কি করবাে তুমি বলে দাও খালা? তােমার
ভালােবাসা রক্ষা করবাে, না কি অন্য দিকে নিজের ঘরে আলাে জ্বালাব
, আমি কিছুই ভাবতে পারছি না, আজ তুমি আমার যেটা করতে বলবে
আমি তাই করবাে।
:-শ্যামলীর কথা গুলাে শুনিয়া, ফাতেমা গভীর ভাবে ভাবিতে লাগিল,
তারপর আপন মনেই বলিল ফাতেমা- আমি যেতে দিতে পারছি না,
শ্যামলী-৬৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
ধরেও রাখতে পারছি না, সত্য কথা বলতে কি বােঝ তােমার ঘরে গিয়ে।
আজকের সন্ধ্যার আলােটা নিজেই গিয়ে দাও।
:- তবে যে আমার রাত হয়ে যাবে খালা।
:- তবে তুমি আর দেরি করাে না তাড়াতাড়ী চলে যাও।
:-শ্যামলী চিন্তা করিতে লাগিল, এই বাড়ীতে সন্ধ্যার আলাে জ্বালিয়ে
দিয়ে তারপর বাড়ীতে যাবাে, যদিও রাত হয়ে যাবে, তবুও তার মন
বলছে আজ সাজুর বাড়ীতে বাতি জ্বালাবে, কিন্তু ফাতেমা যখন কহিল-
তুমি আর দেরি করাে না চলে যাও------
তখন শ্যামলীর হৃদয় যেন শুন্য হয়ে গেলাে, ফাতেমাকে কহিল- তবে
আমি চলে গেলাম, নিজের সঙ্গে কহিতে লাগিল- আমি যাকে চেয়ে
ছিলাম, তাকে আর পাব না, কত আশার স্বপ্ন সাধনা আজ কাচের মত
ভেঙ্গে চুরে খান খান হয়ে গেলাে! যা হবার নাই তা আর কোন দিন হবে
সেই আশা করে আর কোন লাভ হবে না, আজ হতে আমার নিজের
মনকে শক্ত করতে হবে, নিজে নিজে কেন আমি সাজুকে ভালাে
বাসলাম!, আমি যে আজ সাজুর ঘর নিজের ঘর মনে করে ছিলাম,
নিজের ঘর মনে করেই সন্ধ্যার আলাে জ্বালাতে চেয়েছিলাম, তা হয়তাে
আর হবে না, খালা কি দুলির সঙ্গে সাজুর বিয়ে দেবে, তায় আমার
ফিরিয়ে দিল, ওরা একে অপরের আপন হতে পারবে না, আমার
ভালােবাসার ভুল ছিলাে না, আজও ভুল নেই, এমনি করেই গােপন
ভালােবাসা গােপনে রয়ে যাবে, এই ছাড়া আমার আর উপায় কি বা
আছে-----!!!
:-একা একা পথ চলতে চলতে বাড়ী পৌছে গেছে এতক্ষন, আনমনা
ভাবে নানা চিন্তা করতে করতে নিজের বাড়ীর কথা দুনিয়ার ভালাে মন্দ
সবি যেন ভুলে গিয়েছিল, বাড়ী আসিয়া আবার নতুন করে ভাবিয়া
দেখিল নিজের
সঙ্গে নিজে কহিল- একি আমি ভাবছি, আমার ঘরে আলাে জ্বালাতে
হবে, গেটের দরজা খুললাে, তারপর ঘরে গিয়া আলাে জ্বালাল, তারপর
পড়ার ঘরে গিয়ে বসলাে এবং কহিল- আজকের নামাজ পড়া হলাে
--------, কি করে এই জীবন অতিবাহিত করবাে কিছুই ভাবতে
পারছি না। এমনি করে ভাবতে ভাবতে রাত নয়টা বাজিয়া গিয়াছে।
শ্যামলী-৬৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-পিতি আসিয়া খাবার টেবিলে ভাত রাখিয়া কহিল- বুবু টেবিলে খাবার
রেখেছি তাড়াতাড়ি এসাে, আমার শরীরটা ভালাে নাই, আমার খুব শীত
লাগছে।
:- তাের কি জ্বর হয়েছে?
:- মনে হচ্ছে তাই, ক্ষুধা নেই শীতে দাঁড়াতে পারছি না, মন বলছে।
বিছানয় শুয়ে পড়ি।
:- আমার কাছে আয়।
:-পিতি শ্যামলীর কাছে গিয়ে দাঁড়াইল।
:-শ্যামলী গায়ে হাত দিয়ে কহিল- তাের গায়ে যে খুব জ্বর, ঔষধ
খেয়েছিস?
:- না তুমি বাড়ী ছিলে না তাই ঔষধ আনতে যেতে পারিনী।
:- তবে তুই যা শুয়ে পড় গিয়ে, আমি পরে খেয়ে নেব, অসুবিধা হলে
আমার ডাকবি। পিতি তার নিজের ঘরে চলিয়া গেলাে।
:-শ্যামলী নিজের বিছানাই গিয়ে বুকে বালিস দিয়ে আর্তনাদে ছট ফট
করিতে লাগিল, শুধু ভাবিতেছিল, সাজু দুলির সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছে,
আমার ভুলেই গিয়েছে! যার এই মন দিয়েছি, অগুনিত টাকা খরচ করেছি।
তবুও আজ তার মন পেলাম না!, এতকিছু করে আজ আমার কি
হলাে-----------এমনি করিয়া ভাবিতে ভাবিতে শ্যামলী ঘুমিয়ে পড়িল।
*****************************************
ভােরের পাখীরা উঠিয়াছে চারি দিকে পাখিদের গানের কলরব, বন বাগানে
বসন্তের কোকিলের ডাক, দোয়েল, ঘুঘু শালিকেরা--- শ্যামল সুন্দর গ্রাম
খানি গানে গানে ভরিয়া তুলিয়াছে-------, আজানের ধ্বনী ভাসিয়া।
আসিল শ্যামলীর কানে।
:-ফজর নামাজ আদায় করিয়া বাড়ীর বাহিরে চলিয়া আসিল, মনের মাঝে
সস্থি পাচ্ছিল না, মনের মাঝে বড়ই অশান্তি, কোন কিছু স্থির করিতে
পারিতেছিল না, বড় দুঃখের সঙ্গে পিতা মাতার কবর পাসে আসিয়া
দাড়াইল! এবং পিতা মাতার জন্য খােদার দরবারে মােনাজাত করিল
------
*****************************************
:-ফাতেমা নামাজ শেষ করিয়া মােনাজাত করিতেছিল, হে মহা
শ্যামলী-৬৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
পরিচালক, করুনা ময় আল্লাহু তা'আলা তুমিই মহান, তােমার মত আর
দ্বিতীয় নাই, তুমিই সবার সেরা, তােমার দরবারে দু’হাত তুলে মােনাজাত।
করছি, আমার সমস্ত গুনা মাফ করে দাও, আমার সকল প্রার্থনা তুমি কবুল
করে নাও, তােমার দরবারে আকুল আবেদন, আমার সকল আশা পুরন
করিও, হে করুনাময় তুমি সাগরকে মরুভুমি করতে পারাে, আর
মরুভুমিকে সাগর করতে পারাে, তােমার কাছে আর কিছুই চাইনা
, শ্যামলী ও সাজুর মাঝে দু’জনার মিলন করিয়ে দিও, অতিরিক্ত চিন্তায়
ফাতেমা যেন কেমন হয়ে গেলাে, শরীরের সমস্ত সিরায় রক্ত যেন তার বন্ধ
হয়ে গেলাে, আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়লাে, তারপর নিজের বিছানায়
অতিকষ্টে গেলাে, নিজে নিজের বিছানায় শয়ন করিল, ছােট ছােট করে
একা বলিতে লাগিল- আমি বড় ভুল করেছি--------, কেন শ্যামলীর
পাঠিয়ে দিলাম, হয়তাে বড় আশা করে আমার বাড়ীতে এসেছিল, আমি
জানি শ্যামলী ভালােবাসে সাজুকে, হয়তাে সাজু ও ভালােবাসে
শ্যামলীকে, ওদের দুজনার ভালােবাসা আমি আজো বুঝতে পারিনী, দুলি
সাজুর ভালােবাসে কি না তাও জানি না, কাহারও মনের খবর আমি কিছুই
জান্তে পারিনী, ওরা এখন আমার পাসে কেউ নেই, হয়তাে ওদের সঙ্গে
আমার আর দেখা হবে না, সারা জীবনের মত কি শ্যামলী সাজুর কাছে
চলে এসেছিল? সাজুর ঘর কি নিজের ঘর ভেবে আলাে জ্বালাতে
চেয়েছিলাে, আমি কিছুই ভাবতে পারছি না, বড় আশা ছিলাে, শ্যামলীর
সঙ্গে সাজুর বিয়ে দেবাে কিন্তু তা যেন আর হলাে না--------! দুলির সঙ্গে
সাজু চলে গেলাে, শ্যামলী বাড়ী ফিরে গেলাে, আমার কাছে আর কেউ
রইল না, সত্য কথা আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মৃত্যু যেন আমার।
ডাকছে আমি হয়তাে আর বাচবােনা।
*****************************************
:-শ্যামলী পিতা-মাতার কবর স্থান থেকে বাড়ী আসিয়া, বিছানার উপর
বালিশ তার উপর বুক রাখিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিলাে, অনেকক্ষন।
ধরিয়া চোখের পানি পড়িল, তারপর আপন মনেই অশ্রু ঝরা থামিয়া
গেলাে, মনে মনে শ্যামলীর একটা খেয়াল হইল আজ আমার শক্ত হতে
হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, সাজুকে ভালােবেসে ছিলাম----কিন্তু থাকলে চলবে না, পৃথিবীতে।
শ্যামলী-৬৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
সবাইতাে ভালােবাসা পাইনা, তায় আমারও ভালােবাসার মূল্য পেলাম
, সাজু দুলির সঙ্গে চলে গেলাে--------!, হয়তাে ওরা একে অপরের
ভালােবাসে ওদের ভালােবাসার মুল্য আছে, আমার ভালােবাসার কোন
মূল্য পেলাম না যেখানে, সেখানে কেমন করে যাব, সাজুর কাছে আমি।
হয়তাে ঘৃনার পাত্রী, সাজু আমায় ঘৃনা করলাে কিন্তু আমি সাজুর
কোনদিনই ঘৃনা করবাে না, সারা জীবন যেমন ভালােবেসে গেলাম
, তেমনি ভাবে ভালােবেসে যাবাে, এই মন দিয়ে আর কারাে ভালােবাসতে
পারবাে না, ব্যার্থ প্রেমে পড়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু হওয়া সেই অনেক।
ভালাে, কিন্তু তবুও যে আমার বেঁচে থাকতে হবে, তা ছাড়া আমার আর
উপায় কিবা আছে------! এখন আমার অনেক ছেলে-মেয়েদের মাঝে
থাকতে হবে, কিন্তু ওদের পাবাে কোথায়!, আর কেমন করেই বা
পাবাে------! সাজু হাসপাতাল খুলবে অনেক অর্থ আয় করবে, অনেক
ছেলে-মেয়েদের মাঝে থাকবে, নানা জনের সঙ্গে মিসবে, সাথে সাথে
অর্থ আয় করবে, আর আমি সাজুকে ভালােবেসে তাকে না পেয়ে ধুলােয়
মিসে যাবাে তা হয় না। আমি অনেক ভেবে দেখেছি মানতে পারব না।
যে যন্ত্রনা বুকে বেধে নিয়েছি, বইতে আমার হবেই, মরতে যখন
পারলাম না, আমিও পাঠশালা খুলব, যে পাঠশালা খুলতে চেয়েছি, সাজু
একদিন আমার অনুরােধ করে বলেছিল- আমি যদি পাঠশালা খুলি তবে
তােমাকে ঐ পাঠশালায় শিক্ষিকা হতে হবে, সাজুর অনুরােধে আমি
পাঠশালা খুলব-------। ঐ পাঠশালায় আমি সমস্ত কিছু বিলিয়ে দেব,
ওদের মাঝে, বাকি দিন গুলাে কাটিয়ে দেব ওদের মাঝেই, আমি বেঁচে
থাকবাে ওদের নিয়ে, আনন্দ অনুভব করব আমি।
ওদের মাঝেই--------এই আমার এক মাত্র পথ। এমনি করিয়া ভাবিতে
ছিল শ্যামলী, কিছুক্ষণ পর অন্য এক মনের মত কহিল শ্যামলী
খােদাকে ভালােবাসলে আমি নিরাস হবাে না, যার ভালােবাসলে আমি
অনন্তকাল সুখে থাকতে পারবাে, যাহার ডাকলে এই কাল পরকাল সুখে
থাকতে পারবাে, এমনি করেই ভাবিতেছিল।
: -এমনি সময় পিতি, শ্যামলীর ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল- বুবু একটা
দুঃখ জনক সংবাদ!
:- কিসের?
শ্যামলী-৬৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-সাজু ভায়ের মা মারা গেছে................!!!
:- একি বলছ তুমি, খালা মরতে পারে না---------!!!, আমি যে কাল।
সন্ধ্যার আগে ভালাে দেখে আসলাম, আমি তােমার কথা বিশ্বাস করতে
পারছি না।
-দেখুন মৃত্যু সংবাদ কখনও মিথ্যা হয় না, আমি নিজে চোখে দেখে
আসলাম সাজু ভাই ও দুলি বুবু ওরা কেহ বাড়িতে নেই, কিন্তু আমরা যে
কিছুই বুঝতে পারছি না, সাজু ভাই দুলি বুবু ওরা কোথায় গেলাে ?
:- ওরা কোথায় গেলাে আমি জানি কিন্তু------------ এমন
হলাে কেন আমি কিছুই ভাবতে পারছি না.......!!!, দুলি আর সাজু ওরা।
খালার বাড়ি বেড়াইতে গিয়াছে, তুমি এক কাজ করাে খােকন, সাজুকে
নিয়ে এসাে, খােকন চলিয়া গেলাে।
*****************************************
:-শ্যামলী হাজির হলাে তার মায়ের মত মৃত খালার কাছে।
বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদিতে লাগিল, খালা তুমি মরতে পার না, তুমি
মরে গেলে আমি কার কাছে দাড়াব-----------!, কে আমার আপন
করে ভালাে বাসবে!, আমি কার আচলের ছায়ায় দাড়াব!, আমার যে
আপন করে ভালাে বাসার কেউ রইল না!, আমি যে মা হারিয়ে তােমার
পেয়ে ছিলাম, মায়ের আদর তুমিই দিয়েছিলে, আমার জন্য এই বিশাল
পৃথিবীতে ভালােবাসার আর কেউ রইল না-- আমার নাম ধরে আর
কেউ ডাকবে না-----------!!!
:-সাজু আসিয়া মায়ের মুখের উপর মুখ রাখিয়া কহিল- মা তুমি--তুমি
এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলে, তােমার জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম
, তুমি দিনের পর দিন না খেয়ে আমার মানুষ করেছ! আর আজ আমি
তােমার জন্য সুখের দিন ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি, এই সুখের দিন তােমার
কপালে সহিল না---------!!! আমি পারলাম না তােমার মুখে হাসি
ফুটাতে, মা তুমি যে কষ্ট করে আমার লেখা পড়া শিখিয়েছ, সেই কষ্টের
কথা আমার মনে পড়লে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না, মা
তােমার জীবন দুঃখের সঙ্গে সাথী করে গেলে, সুখ তােমার ভাগ্যে জুটল।
না------!!! বিধাতা তােমার জীবনে দুঃখ দিয়ে গেলাে সুখ দিল না।
খােদা পাক যাদের দুঃখ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায়, তাদের দুঃখের মাঝখান
শ্যামলী-৬৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
থেকেই আবার নিয়ে যায়, এই কি বিধাতা তােমার লিলা খেলা---- !!!
এই কি বিধাতা তােমার লিলা
খেলা----------------- !!!
এখানে যারা ছিল তারা সবাই দুখের সাথী হয়ে গেলাে, সবার চোখে
অশ্রু ঝরছে। মায়ের মুখ থেকে সাজু মাথা তুলিয়া কহিল- হায় বিধাতা
তুমি আমাদের জন্য একি বিচার করলে-------!!! হে খােদা তুমি
ভালােকে মন্দ করতে পার, আর মন্দকে ভালাে করতে পার, কিন্ত।
আমাদের জন্য কি কিছুই করতে পারবে না---- দয়া ময় খােদা, তবুও
তােমারই উপর ভরসা
:-এর পর একজন যুবক আসিয়া সাজুর হাত ধরিয়া কহিল- ভাই আর।
দুঃখ করাে না, মৃত্যুর পথে আমাদের সবার যেতে হবে, দুনিয়াতে সারা
জীবন কেহই বাঁচতে আসেনী, এক দিন আমাদের ও যেতে হবে, কেঁদে
কেঁদে আর কোনাে লাভ হবে না ভাই।
:-অন্য আর এক হাত ধরিয়া শ্যামলী কহিল- সাজু, তুমি আর দুঃখ।
করাে না, আমিও তাে বেঁচে আছি, আমি কেমন করে বেচে আছি, কি।
নিয়ে বেচে আছি, এক বার চিন্তা করে দেখ --------------!
:-কাঁদিতে কাঁদিতে সাজু কহিল- তােমরা সবাই জান আমার মা কত
কষ্ট করেছে, শুধু আমার জন্য সেই মায়ের জন্য আমি যে কিছুই।
করতে পারলাম না-!!!
:-কয়েক জন আসিয়া সাজুকে তার মায়ের নিকট হতে কিছু দুরে নিয়া
গেলাে, সবাই সান্তনা দিতে লাগিল।
:-শ্যামলী সাজুর হাত ধরিয়া কহিল- তুমি আর কেঁদনা, আমার জীবন।
কেমন, এক বার ভেবে দেখ-------------!!! আমিও তাে সব কিছুই
মানিয়া এতটা পথ এসেছি, তােমারও পারতে হবে আমার মত করে,
তা ছাড়া আর উপায় নেই, এই দুঃখ বইতে হবে নিরবে, খােদার।
দরবারে ফরিয়াদ করাে পর কালে যেন খালা সুখে থাকে, তাছাড়া আর
তাে কিছুই করার নেই।
:-একজন বৃদ্ধ মহিলা আসিয়া সাজুর মুখে হাত রাখিয়া কহিল- বাবা
তােমার মা বড়ই ভালছিল, ভালভাবেই গিয়েছে বিধাতার ডাকে
সাড়াদিয়ে পরপারে, তুমি দুঃখ করনা এ ভাবেই আমাদের সকলকে
শ্যামলী-৬৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
একদিন চলে যেতে হবে বাবা।
:-অন্য আরেক জন আসিয়া কহিল বাবা----------- তুমি তােমার
মায়ের জন্য খােদার দরবারে হাত তুলে দোয়া কারাে, তােমার মা যেন
পরকালে সুখে থাকে, পিতা-মাতার জন্য সন্তান যদি দোয়া করে বিধাতা
সেই দোয়া সাথে সাথে কবুল করে নেয়, আর কেঁদোনা বাবা, শ্যামলীর
পানে একবার চেয়ে দেখ কেমন করে দুনিয়ায় বেঁচে আছে।
:- তখন শ্যামলীর দু’চোখ ফাটিয়া অশ্রুর নদী বহিয়া যাইতেছিলাে, অশ্রু
ভরা টলমল নয়ন লুকিয়ে রেখে শ্যামলী কহিল- আমরা বেঁচে আছি,
হাসি মুখে খালার কবর দেব ও খালার জন্য বিধাতার কাছে দোয়া করব,
তাতে আমাদের খালা শান্তি পাবে----------! নিজের চোখের পানি
লুকিয়ে রেখে শ্যামলী শুধু সাজুকে সান্তনা দিয়েই চলেছে।
:-গ্রাম বাসিরা সবাই মনে প্রানে বলিতে লাগিল, সাজু আর শ্যামলী ওরা
দুই মায়ের সন্তান হলেও আজ মনে হয় একই মায়ের সন্তান, সাজু তার
মায়ের মৃত্যুর জন্য বড়ই দুঃখিত, এক দিনের জন্য মায়ের সুখ দিতে
পারলাে না, এই আঘাত সাজু সহ্য করিতে পারছে না!
:-শ্যামলীর চোখ ফাটিয়া বুক বেয়ে নদীর মত অশ্রু ধারা বন্যা হয়ে বয়ে
চলেছে বহতা নদীর উপচে পড়া প্লাবনের পানির মত, তবুও শ্যামলী
সাজুর সান্তনা দিচ্ছে, এটাও ছিলাে শ্যামলীর অবদান, আজ শ্যামলীর
জন্য অনেকটা দাঁড়াতে পারলাে সাজু, যার আপন বলতে কেউ নেই এই
পৃথিবীর বুকে, সে এক জনের পাসে থাকবার জন্য কতই না চেষ্টা
করছে।
| পরবর্তি কালে কি হবে কে জানে।
:-অন্য দিকে দুলি দাঁড়িয়ে আছে কিছুই বলছে না, মনে মনে দুলি শুধু
ভাবছে, এমন সময় দুলি সাজুর কাছে না থাকায় ভালাে, শ্যামলী যদি
পাসে থাকে সেই ভালাে হবে, এক মাত্র সান্তনা দিতে পারবে শ্যামলী,
এখন আমার অনেক দুরে থাকায় ভালাে, আমি জানি ওরা দুজন একে
অপরের ভালােবাসে, ওদের প্রেম চির অমর হয়ে থাক।
অন্য দিকে কবর তৈরী করতে লাগলাে কিছু লােক। তারপর
কাফন দাফন করা শেষ হয়ে গেলাে, কিছু লােক চলে গেলাে আর কিছু
শ্যামলী-৭০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
লােক থেকে গেলাে, কেউ বা সান্তনা দিতে লাগলাে, কেউ বা দুঃখ প্রকাশ।
করতে লাগলাে!
:-কিছু সময় পর আকলিমা বলিল- সাজু, তুমি আমাদের বাড়ীতে চলাে।
এখানে তাে তােমার দেখা সােনার কেউ নেই, আমি তােমার খালা হয়ে
রেখে যেতে পারি না বাবা, চলাে আজই আমার সঙ্গে!
:-অশ্রু ভরা নয়নে সাজু কহিল- খালা, আমি মায়ের কবর ছেড়ে কোথাও
যেতে পারব না, খালা, আমি কোথাও যেতে পারব না।
:-আমার সঙ্গে না গেলে তােমার দেখা সােনা করবে কে? আমি ছাড়া
তােমার দেখা সােনা করার আছেই বা কে?
:-আকলিমার মুখের কথা কাড়িয়া শ্যামলী বলিল- খালা, সাজু ভায়ের
দেখা সােনা আমিই করবাে।
:-আকলিমা রাগে শ্যামলীকে বলিল- তুমি সাজুর কি এমন আপনজন, যে
তুমি সাজুর দেখা সােনা করবে?
:-শ্যামলী একটু নিরব থাকিয়া, মলিন মুখে বলিল-খালা, আমি সাজুর
কেউ নয়, বাল্য জীবনে আমার যখন মা ছিলাে না, তখন সাজু ভায়ের মা
তার আচঁলের নিচে ঠায় দিয়েছিলাে, সাজু ভায়ের মা বাল্য জীবন থেকে
মৃত্যু পর্যন্ত আমার দেখা সােনা করেছে, তায় সাজু ভায়ের বিপদের দিন।
গুলাের খেদমত করতে চায়, সাজু ভাই যখন যেতে চাচ্ছে না, আমার
কাছেই থাক, আজ মায়ের কবর সমাধী শেষ করে সেই স্থান ত্যাগ করা
যায় না, “মা”
হারিয়ে সেই স্থান কেউ ত্যাগ করতে পারে না, তুমি কিছুদিন সাজু ভায়ের
কাছে থাক!
:-অশ্রু স্বজল চোখে সাজু কহিল- খালা, আমি মায়ের কবর রেখে
কোথাও যেতে পারব না, মায়ের জন্য এখন আমার অনেক কর্তব্য বাকি
রয়েছে।
:-শান্ত কণ্ঠে, আকলিমা কহিল- সাজু তুমি কি পাগল হয়ে গেছাে? এই
বাড়ীতে বর্তমানে একা একা থাকা যাবে না, আমার সঙ্গে তােমার যেতেই
হবে, আমি তােমার খালা, আমি তােমার জন্য যা করতে পারি তা আর
কেউ আমার মত করতে পারবে না, শ্যামলী যুবতী মেয়ে তার কাছে
তােমার রেখে যেতে পারি না, অবশেষে লােকে তােমাকে আর ।
শ্যামলী-৭১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
শ্যামলিকে নিয়ে নানা বিভিন্ন কটুকথা রটাবে, তখন কি হবে?
:-শ্যামলী কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া বলিল- লােকে যত কথাই বলুক এই
সময় আমি কিছুই মনে করবাে না, আমি শুধু সাজু ভায়ের সান্তনা দিতে
চায়, এটাই আমার করতে দাও খালা!
:-শ্যামলীর দুঃখের কথা শেষ না হতেই আকলিমা বলিল- তােমার কাছে
রেখে গেলে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে, তখন সাজু সমাজের কাছে।
মুখ দেখাতে পারবে না, কিছু মানুষ আছে তারা সবকিছু বলতে পারবে।
:- মুখ দেখাতে পারবাে না? সাজু ছেলে, আর আমি মেয়ে, সমাজের কাছে
মুখ দেখাতে পারবাে না আমি, প্রয়ােজনে তুমি এখানে থেকে
যাও------------, আমার মনে হয় সেইটায় সব চেয়ে ভালাে হবে!
:- শ্যামলী, তুমি আমাদের মাঝে মাথা ঘামাতে এসনা, এখন থেকে যা
কিছু করবাে সবি সাজুর ভালর জন্য, আমি যা করবাে পৃথিবীর আর কেহই
তা করতে পারবে না, এবার তুমি বুঝতে পেরেছ?
:- খালা তুমি যা কিছু বলছ সবি আমি বুঝি, এখন আমি অনেক বড় হয়েছি
আগের মত ছােট খুকি নেই যে, তােমার কথা আমি বুঝতে পারব না,
আজ খালা মারা গেছে, আমার বক্তব্য মারা গেছে, কিন্তু আমার কর্তব্য
মায়ের ও সাজুভায়ের জন্য মারা যায়নী----------!, কিন্তু আমি বেঁচে
আছি, আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবে ততদিন থাকব, তােমাদের মাঝে
জড়াতে যাব না, তােমরা যে আপন আর আমি যে তােমাদের কাছে পর,
তায় আমার অনেক দুরে থাকায় সবচেয়ে ভালাে হবে----------!!! সাজু
ভাই, এতদিন পর
আমি আজ সত্য কথাটা বলতে পেরেছি, এর চেয়ে আর সত্য কথা আছে।
কি?
:-অশ্রু স্বজল চোখে সাজু, শ্যামলীর মুখের পানে চেয়ে রইলাে-------
উভয়ের চোখের পানিতে বুক ভাসিয়া যাইতে লাগিল, একে অপরের দিকে
অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাে---- ----------!
:-কিছুক্ষণ পর সাজু কহিল- শ্যামলী, তুমি বাড়ী চলে যাও!
:-শ্যামলী একান্ত নিরুপাই হয়ে মনের দুঃখে কহিল- খালা, দুলি ও সাজু।
ভাই, তােমরা সবাই থাক আমি নিজেই চলেযাচ্ছি, আমার প্রয়ােজনে
শ্যামলী-৭২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আবার আসব, আজ চলি!
:-কথা গুলাে বলিয়া শ্যামলী চলিয়া গেলাে, চোখের জল মুছিতে মুছিতে,
অশ্রু স্বজল চোখে শ্যামলী বাড়ীর পথে চলিয়া গেলাে।
:-দুলি তার মায়ের প্রতি রাগ করিয়া বলিল-মা, তুমি শ্যামলি বুবুকে।
এমন করে বলতে পারলে?
:- আমি এমন কিছু বলিনী যে, শ্যামলীর মনের ক্ষতি হয়েছে, এখানে।
থাকলে তার নিজের বাড়ীতে থাকবে কে।
:- সাজু ভায়ের কাছে শ্যামলী বুবু থাকলে ভালাে হতাে।
:- শ্যামলী থাকলে ভালাে হতাে না, তুমিই থাকো।
:- আমি আর শ্যামলী আকাশ পাতাল দুরুত্ব, শ্যামলী যা পারতাে আমি
তা কোন দিন পারব না।
:-সাজুর চোখে ঝরনার মত অশ্রু ঝরিতেছে তারই ফাকে, সাজু কহিলখালা,
সবার সংসার আছে, তােমাদের নিজ নিজ সংসারে তােমরা চলে
যাও, আমার কাছে কারাে থাকতে হবে না! আমি একাই থাকতে পারবাে,
আমার জন্য তােমরা খেদমত করলে তােমাদের সংসার চলবে কিকরে,
আমার মা আখেরাতের পথে যাত্রা করেছেন! তােমরা আমার মায়ের
জন্য দোয়া করাে, আমার মা যেন বেহেস্থ পায়, তােমাদের কাছে আর
কোন কিছুর আশা করি না! আমার মায়ের কবর ছেড়ে কোথাও যেতে
পারবাে না, আমি মায়ের কবর স্থানে চলে
গেলাম-------------------!
:- একটু দুঃখীত কণ্ঠে দুলি বলিল- মা তুমি বড় ভুল কথা বলে ফেলেছ,
তােমার কথায় সাজু ভাই মনে হয় অনেক দুঃখ পেয়েছে, আজ ভায়ের
মনের খবর তুমি বুঝতে পেরেছ?
:-আকলিমা বলিল- আমি এতকিছু বুঝতে চাইনা, তােমার ভালর জন্যই
সব সময় সাজুর পাসে থাকতে বলছি।
:- মা, আমি তােমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, সাজু ভায়ের পাসে
সারাক্ষণ কেন থাকতে হবে আমার?
:- আকলিমা, বলব আজ নয় অন্য দিন, সাজু বুবুর কবর পাসে গিয়েছে,
সাজুকে ফিরিয়ে নিয়ে আই, আমি একটু পরে আসছি।
:- আমার যে কর্তব্য আছে সে কর্তব্য পালন করবাে সারাক্ষণ, আমি
শ্যামলী-৭৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
এখন বুঝতে পারি ভালাে মন্দ, তােমার বলে দিতে হবে না, মায়ের
কথায় জবাব দিয়ে ফাতেমার কবর পাসে চলিয়া গেলাে- দেখিল,
শ্যামলী ও সাজু দু’জনা মায়ের কবর জিয়ারত করছে।
:-কিছুক্ষণ পর আসলাে দুলি, পিছনে আকলিমা, ওরা সবাই জিয়ারত
শেষ করলাে।
:-কিছুক্ষণ সবাই নিরব থাকিয়া তারপর শ্যামলী বলিল- দুলি, সাজু
থাকলাে তুমি দেখ, তুমি সাজুর পাসে থাকলে বড়ই ভালাে হবে, আমি
চলি -------------------------!!!
:-আমি সাজু ভায়ের পাসে থাকবাে আর তুমি চলে যাবে? তা হয় না,
তুমিও সাজু ভায়ের পাসে থাকবে।
:-না, না, তা হয় না, আমি সাজুর পাসে থাকলে, সমাজের বিভিন্ন লােক
বিভিন্ন কথা বলবে ও মানবে না আমার পাসে থাকা, তুমি সাজুর পাসে
থাকলে সেই ভালাে হবে এর চেয়ে আর ভালাে হয় না।
:-যায় তুমি থাকলে কেউ কিছু বলবে না।
:- যে যাই বলুক তাতে তােমার কিছু আসে যায় না, তােমার থাকতে
হবেই সাজু ভায়ের পাসে।
:- না, না, তা হয় না দুলি, আমার বাড়ী আমি চলেযায়, সেই সব চেয়ে
ভালাে হবে।
:- তুমি চলে গেলে সাজু ভাই খুব কষ্ট পাবে, তা কি তুমি একবার ভেবে
দেখেছ? - সময় করে আমি আসবাে তুমি সাজুর পাসে থেক।
: -এবার সাজু শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে কহিল- শ্যামলী তুমি তাড়াতাড়ি
বাড়ী চলে যাও, আমার পাসে কাহারও থাকতে হবে না, আমার বিধাতার
কাছে অনেক চাওয়ার বাকি আছে, আমি একা থাকলে সেই ভালাে হবে,
এক মনে খােদার দরবারে মােনাজাত করতে পারবাে, অনেক কিছু
চাইতে পারবাে-------- !!!
:-অশ্রু সজল চোখাে শ্যামলী প্রস্থান করিল, অশ্রু স্বজল চোখে শ্যামলী
যখন চলিয়া গেলাে তখন--------
:-আকলিমা সাজুকে কহিল- সাজু তুমি আর দুঃখ করাে না ঘরে চলাে,
মা মরিলে চোখের জল ফেলতে নেই, তুমি কাঁদলে যে মা কষ্ট পাবে,
শ্যামলী-৭৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
তুমি হেসে খেলে বেড়ালে তােমার মা খুশি হবে।
:-একটু নিরব থাকিয়া সাজু বলিল- খালা পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে,
সে ইচ্ছা করে কাঁদে, আমার হৃদয়কে কিছুতেই বাধ মানাতে পারছি না,
মা আমার কিভাবে মানুষ করেছে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না, মায়ের
কষ্টের কথা আমি যে সারা জীবনে ভুলতে পারবাে না, আমার জন্য যে মা,
সারা জীবন কষ্ট করে গেলাে। সেই মায়ের জন্য মৃত্যুর আগে সুখী করতে।
পারিনী, কিন্তু মা আমার জন্য কত কিছু করতে পেরেছে, এর চেয়ে আর
কত দুঃখ থাকতে পারে, তােমরা সবাই নিজ নিজ বাড়ীতে চলে যাও, শুধু
আমার মায়ের কবর স্থানে আমাকে নিনিবিলি থাকতে
দাও-----
:-দুলি সাজুর হাত ধরিয়া কহিল- সাজু ভাই তুমি একাই থাকবে, কিন্তু
এখন এই ভরা সন্ধ্যায় ঘরে চল, আমার মন বলছে সারা জীবন একাই
থাকতে পারবে, চলাে ঘরে চলাে।
:- দুলি, আমি সারা জীবন একাই থাকতে পারবাে।
:- ইচ্ছা করলে সবকিছু পারা যায়, চলাে আর দেরি না, মা তুমি সাজু
ভাইকে নিয়ে যাও।
:-আকলিমা শান্ত কণ্ঠে বলিল- চলাে বাবা সন্ধ্যায় কবর স্থানে থাকতে
নেই।
:-আকলিমা ও সাজু কয়েক পা এগিয়ে গেলাে, তারপর আকলিমা বলিল
দুলি তুমি এসাে।
:- মা আমার আসতে দেরী হবে তােমরা যাও।
:-আকলিমা ও সাজু ঘরে ফিরিল।
:-দুলি ফাতেমার স্বরনে পাসে দাঁড়িয়ে বলিতে লাগিল, তখন কবরের
কাছে আর কেহ ছিলাে না, একা দুলি কহিতে লাগিল। খালা তুমি চলে
গেলে সারা জনমের মত কিন্তু, সাজু ভাই আর শ্যামলী বুবুর জন্য কিছুই
করে গেলে না------!!! এখন কে কোথায় থাকবে জানি না----! সেই
ছােট্ট বেলার খেলার সাথী ওরা, আজ একে অপরের ছেড়ে কে কোথায়।
থাকবে, জানি না---- !! এই সবের জন্য দায়ি এক মাত্র আমার মা! এর
জন্য আর কেউ দায়ি নয়, আজ মা কেন বুঝতে পারছে না, ওরা দু’জনা।
একে অপরের ভালােবাসে, সবি জানে তবুও মা সাজু ভায়ের পাসে
শ্যামলী-৭৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
আমার দাড়াতে বলছে, একি করে হয়, না আমি এমন কাজ কিছুতেই
করতে পারব না, আজ খালা বেঁচে থাকলে সব কিছুর সমাধান দিতে
পারতাে কিন্তু, আজ এই সমাধান দেবে কে? আমি কিছুই ভাবতে পারছি
, এই ভাবনা আমার আর কারাে নয়, এই সমাধান আমারই করতে।
হবে।
: -এমনি সময় সাজু আসিয়া দুলির পাসে এসে দাঁড়াইল, দু’জনা কিছুক্ষণ
নিরব থাকিয়া সাজু কহিল- দুলি, এখন অনেক রাত হয়ে পড়েছে, চলাে
ঘরে যায়, স্বজল চোখে দুলি সাজুর দিকে একবার তাকিয়ে বলিল- সাজু
ভাই ঘরে তাে যেতে হবে তার আগে একটা কথা বলতে চায়।
:-শান্ত কণ্ঠে সাজু বলিল— সব কথায় থাক, আজ আর কোন কথা নাই।
:- অনেক কথায় বলার আছে, কথা গুলাে বলতেই হবে।
:- যে কথা না বলিলে নাই, সে কথাও বলার অনেক সময় আছে, সন্ধ্যা
ঘনিয়ে আসলাে ঘরে চলাে।
:- যে সময় চলে যায় সেই সময় আর পাওয়া যাবে না, সাজু ভাই কথাটা
বলতে আমার বারবার ইচ্ছা হচ্ছে।
:- দুলি এই সময় কথা বলার সময় নয়, সময় সামনে আরাে কত
আসবে, তখন আমিও না বলব না, চলাে খালা আমাদের জন্য অপেক্ষা
করছে।
:- আজ আমার কথা যদি নাই শােন তবে চলাে।
| দুলি ও সাজু নিজেদের ঘরে চলিয়া গেল।
*****************************************
:-সময় রাত আট টা, শ্যামলীর নিজ ঘরে, শ্যামলী রিক্ত হৃদয় নিয়ে কি
করছে, নিজের সঙ্গে নিজে প্রশ্ন যে, আকাশের তারা ছােয়া যায় না, ঐ
আকাশের তারায় হাত না বাড়ান ভালাে, যে সাজুকে ছােট্ট বেলা থেকে।
আজ পর্যন্ত ভালােবেসে গেলাম সেই ভালােবাসার মুল্য পেলাম না,
আমার এই মন প্রান সবিই তাে তাকেই দিলাম, যাহার সারা জীবন
ভালােবেসে গেলাম, তাকে আজ হারালাম, আমার ভালােবাসা মিথ্যা
হয়ে গেলাে, এ জীবনে আর কি বা আছে!? সবি তাে হারিয়ে ফেলেছি,
আমার আর হারাবার ভয় নেই, আর কি বা আছে এমন, আমার সকল
আশা আজ সব শেষ হয়ে গেল, শ্যামলীর চোখে অশ্রু, ললাট কাপছে,
শ্যামলী-৭৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
পিতা মাতার ছবির দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে, মুখে আর
কোন কথা নেই! এত বড় আঘাত আর কোনদিনই পাইনী, মা-বাবা মারা
যাবার পর দুঃখের সময় গুলাে সাজুর সঙ্গে কেটে গেছে, আজ নিঃসঙ্গ
জীবন আমার, বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে শ্যামলী কহিল- বাবা আমি
এখন কি করবাে? আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিনা! আগামি দিন গুলাে
কি ভাবে কাটাব, তুমি আমার বলে দাও বাবা, আমি আর সামনে
এগােতে পারছি না, আমার এই দুঃখের সময় কেউ পাসে দাঁড়াবার মত
নেই, আমি আজ বড় একা হয়ে পড়েছি! আমার সামনে দাঁড়িয়ে একটা
কথা বলার মত আর কেউ নেই------ -----------! বাবা তুমি ছাড়া
আমার বলে দেবার কেউ নেই, বাবা তুমি একবার কথা বলাে, আমি কি
করব আর কোথায় যাব, তুমি ছাড়া আমার বলে দেবার কেউ নেই, বাবা
তুমি শেষ বারের মত একবার কথা বলাে- বলােনা, মা তােমার কথা
আমি এতদিনে ভুলে গিয়েছিলাম আজ তােমার কথা মনে পড়ছে!
তােমার ছবির দিকে তাকিয়ে আমার এই চোখ দুটো ফিরাতে পারছি না!
বড় আশা করে তােমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তুমি কিছু বলাে, বলাে মা
তুমি কিছু বলাে! আমি তােমারই মেয়ে মা, আমি আজ সব চেয়ে
বেশী দুঃখ পেয়েছি, আমার পাসে আজ কেউ নেই, আমি আজ একা,
আমি আজ একা--------- !!! মা তুমি আগে চলে গেছাে, বাবা
অনেকদিন পরে গেল তােমরা পারনী আমার জন্য একটা ভাই রেখে
যেতে, পারনী আমার জন্য একটা বােন রেখে যেতে, যদি আজ আমার
আপন ভাই বােন থাকতাে তবে এই দুঃখের সময় আমি তাদের কাছে
গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম, আজ যদি ভাই-বােনদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে
পারতাম, তাহলে অনেক শান্তি পেতাম, কিন্তু সেই ভাগ্যও আমার আজ
নেই, আমার মত অসহায় আর কে আছে, আমার মত দুঃখী জীবন আর
কয় জনের আছে, আমি আজ বড় একা তােমাদের মৃত্যুর পর, যার
আঁচলের নীচে ঠায় পেয়েছিলাম সেও আজ তােমাদের পথে, পথ যাত্রী
হয়ে গেছে, যার এই হৃদয় দিয়ে ভালােবেসে ছিলাম, সেও অনেক দুরে
চলে গেলাে, আমি কোথায় দাঁড়াব মা------------!!! এমনি
করেই চিন্তা করতে করতে রাত শেষ হয়ে গেছে, ভােরের আজান দিচ্ছে
শ্যামলী-৭৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
মসজিদে, এতক্ষনে শ্যামলী বুঝতে পারিনী কখন ভাের হয়ে গেছে, ওজু
করে নামাজ পড়তে গেলাে শ্যামলী।
*****************************************
:-কিছুক্ষন পর নাসির খান আসিয়া উঠানে দাঁড়াইল কহিল- মা শ্যামলী,
মা-শ্যামলী?
:-এতক্ষনে শ্যামলীর নামাজ শেষ করে দুই তলার উপরে বারান্দায়
দাড়াইল শ্যামলী তারপর কহিল- চাচা, এসাে আমার কাছে এসাে।
:- তােমার কাছে যেতে হলে আমি যে হাপিয়ে যাব, যত কষ্ট হােক আমি
তােমার কাছেই আসছি।
:- চাচা তুমি একটু কষ্ট করেই এসাে।
:-নাসির খা আস্তে আস্তে দুই তলায় উঠিয়া শ্যামলী পাসে গিয়ে
দাঁড়াইল, বুড়াে মানুষ হাঁপিয়ে গেছে।
:-চাচা তােমার সঙ্গে বেশ কয়দিন দেখা হয়নী।
:-একটা টানা নিঃস্বাস ছাড়িয়া নাসির খা কহিল- হাঁ মা, আজ কয়দিন।
বড় মেয়ের বাড়ী গিয়েছিলাম তায় তােমার সঙ্গে দেখা করতে পারিনী,
আজ তােমার কাছে চলে এসেছি, এবার বলাে তুমি কেমন আছ? আর
গত কয়দিন কেমন ছিলে?
:- আমি ভালই আছি----- --- কিন্তু ----------!!!
:- শ্যামলী, কিন্তু মানে কথাটা আমি বুঝতে পারলাম না একটু বুঝিয়ে
বলাে?
:- খালা মারা গেছে----- - খালা, মানে তুমি কার কথা বলছ?
:- যার আঁচলের নিচে আমি একদিন ঠায় পেয়েছিলাম, যে আমার মায়ের
মত ভালােবাসতাে, সে আজ এই জগত ছেড়ে পর কালের পথে চলে গেছে!
:- সাজুর মা মারা গেছে, হায়রে পুড়া কপাল, যার নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখত,
সেই স্বপ্ন দেখা শেষ হলাে না, তার আগেই মারা গেলাে! কত কষ্ট
করেছে কিন্তু সুখের সময় এসছে, সেই সুখ তার ভাগ্যে আর হলাে না।
সাজুর মা দুঃখের দিনে সুখের স্বপ্ন দেখত, কিন্তু দুঃখে জীবন কাটিয়ে।
গেলাে সুখ পেলাে না, তার আগেই সব কিছু ছেড়ে পৃথিবী থেকে।
শ্যামলী-৭৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
খােশনুর আখেরাতের পথে যাত্রী হয়ে চলে গেলাে, এই তাে দুনিয়ার নিয়ম
কাহারও কিছু করনীয় নেই, খােদা যা কিছু করে সবি সত্য, শ্যামলী তমি
কাদছ কেন? কেঁদোনা সুখ আর দুঃখ এই তাে জীবন।
:- চাচা আমি এখন, কার কাছে দাঁড়াব বলাে?
:- চিন্তা করাে না, যার দুনিয়াই কেউ নেই তার জন্য আল্লাহ আছে, তুমি
কেন অযথা চিন্তা করছ।
:- চাচা এই বিশাল পৃথিবীতে আমার দেখবার মত আর কেউ নেই, আজ
আমি একা হয়ে গেছি! এই সুন্দর পৃথিবীর নিয়ম তাে এ রকম
নয়--------!, কিন্তু আমার জন্য কেন এমন হলাে------------!!!
:- পৃথিবীর নিয়ম কখনও বদলায় না, এই পৃথিবী ছেড়ে একে একে
সবায়কে চলে যেতে হবে, কেউ যাবে আগে, আর কেউ যাবে পরে, কিন্তু
যেতেই হবে, সব কিছু অস্বীকার করা যায়, মৃত্যু কখনও অস্বীকার করা
যায় না, কার কখন মৃত্যু হবে সে নিজেই জান্তে পারবে না, জানার
মালিক শুধু মাত্র এক আল্লাহ।
:-পিতি চা রাখিয়া কহিল- বুবু জান তােমাদের জন্য চা আর মুড়ি।
:-শ্যামলী নাসির খাঁর হাতে এক কাপ চা তুলে দিল, নিজে আরএক কাপ
চা হাতে নিয়া বলিল- চাচা চা খাও।
:- শ্যামলী, তুমি চুপ করে আছ কেন কিছু বলাে, কথা না বললে তােমার
অন্তর কষ্ট পাবে।
:-চাচা আমার মুখে আর কোন কথা নেই, কি কথা বলব, আর কোন
কথাই বা বলব, আমার মনে বড় কষ্ট, আর জীবন চলার পথে অনেক
বাধা, তাই আমি নিরব।
:- না তুমি নিরব থাকতে পার না, পথ চলতে গিয়ে থামতেও পারবে না,
তােমার কথা বলতে হবে, তােমার পথ চলতে হবে, তােমার বাবার দিকে
তাকালে তুমি আজ নিরব থাকতে পার না।
:- আমার বাবার মত আমি হতে পারব না।
:- তােমার বাবার মত হতেই হবে, তা না হলে আমি ছাড়ব না মা,
আমরা যে গ্রাম বাসি, সবাই তােমার কাছে বড় আশাবাদি, তুমি
আমাদের আশা পুরন না করলে আমরা সবাই অনেক কষ্টপাব।
:- তােমাদের কিসের দুঃখ যে, আমি ছাড়া সে দুঃখ পুরন হবে না,বলাে
শ্যামলী-৭৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
কি করতে হবে আমার?
:- তুমি শান্ত হও মা, সময় করে আমি সব বলব, আজই বলতে হবে,
এমন কথা নয় সময়ে সব বলব।
:- চাচা আমি তােমাদের মেয়ে হয়ে কি উপকার করতে পারি, সেই
কথাটা আজই বলাে, আমার জীবনের বিনিময়ে চেষ্টা করবাে।
:- আজ বলব না, আমি নিজেই একটু ভেবে দেখি, তারপর তােমার
আমি জানাব, আজ চলি, একথা বলে নাসির খা চলিয়া গেলাে।
:-শ্যামলী নিরব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, অশ্রু ঝরা
নয়নে---------------!, এমনি সময় পিতি প্রবেশ করিয়া দেখিল।
শ্যামলীর চোখে অশ্রু!
:-তােমার এত দুঃখ কিসের বলাে তাে?
:-শ্যামলী চোখের জল মুছে বললাে- আমার চোখে অশ্রু ঝরে শুধু এই
গ্রামকে ভুলতে পারিনা বলে, আমি তােদের ভুলতে পারি না তাই, থেকে
থেকে আমার চোখে এত জল আসেরে।
:-পিতি তার নিজের চোখের জল মুছিয়া শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে রহিল
কাহারও মুখে কোন কথা নেই।।
:-শ্যামলীর ঠোট দুটো কাপছিল কিছুক্ষণ পর শ্যামলী বলিল- পিতি,
আমি তােদের মাঝেই থাকব, তাদের ছেড়ে আর কোথায় যাব বল?
:- তুমি যদি চলে যাও তবে আমরা কোথায় থাকব বলাে?
:- নারে তােদের রেখে আমি আর কোথাও যাব না, তােরা ছাড়া এই
পৃথিবীতে আমার আপন কেহই নেই, তাদের মাঝে আমি সারা জীবন
থাকব, আমি কথা দিলাম।
:- পিতি একটু হাসিয়া কহিল- বুবু আমি একটা কথা বলব?
:- বল কি কথা বলবি?
:- আমি তাে কোনদিন কোন কিছুর দাবি করিনী, আমার মন বলছে
আজই যাব, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
:- কোথায় যাবি বল? তাের কথা আমি আজ অমান্য করব না, তুই
যেখানে যাবি আমিও তাের সঙ্গে যাব, বল কোথায় যাবি?
:-পিতির মনে খুব আনন্দ হইল, আজ বুবু আমার সঙ্গে যাবে এই
আনন্দের মাঝেও পিতির অন্তরে বড় দুঃখ হইল, চোখে যেন তার অশ্রু
শ্যামলী-৮০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
বন্যা বয়ে আসলাে, কিছুই বুঝতে পারলাে না।
:- পিতিকে প্রথমে হাসতে দেখলাম আবার কাদছে, ওর ভিতরের
কি?
পিতি নিজেকে সংযত করে বলিল- মায়ের কবর দেখতে যাব।
:- তােমার মায়ের কবর দেখতে যাবে?
:- হাঁ বুবু আজ আমার মন বলছে যেতে।
:- চলাে? |
:- বুবু সত্যি আমার মায়ের কবর দেখতে তুমি যাবে?
:- যাব আজ, এখনী, চলাে তুমি তৈরী হয়ে নাও, ওরা দু’জনা কবর দেখার
যাত্রি, পথের মাঝে এক বট গাছের ছায়ায় বসিল, সময়টা ছিল বৈশাখ
মাস, গরমের সময় সূর্যের প্রখর তাপ, একটু খানি শীতল ছায়ায় বসিল,
তারপর ধীরে ধীরে এক সময় কবরের কাছে হাজির হলাে।
:-পিতি মায়ের কবর দেখিয়ে দিয়ে বলিল- এই কবরটি আমার মায়ের।
: -শ্যামলী কহিল- তােমার মা যখন মারা যায়, তখন তােমার বয়স কয়।
বছর হয়েছিল?
:- আমি জানি না তখন আমার বয়স কয় বছর হয়েছিল!
:- কে তােমার লালন পালন করলাে?
:- অশ্রু স্বজল চোখে দুঃখের সঙ্গে পিতি বলিল- তাও ঠিক বলতে পারবাে।
, কত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি, কত মানুষ দুরে সরিয়ে দিয়েছে,
কত মানুষ কাছে টেনে নিয়েছে, ক্ষুধার আর্তনাদে এক মুঠ ভাত চেয়েছি
মানুষের দারে দারে, কেউ এক মুঠ ভাত দিয়েছে, কেউ বলেছে ভাত হবে
না, চলে যেতে বলেছে, তখন এই রিক্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে আসতে
হয়েছে। কেহ কেহ কাজের বিনিময়ে একবার খেতে দিত, এমনি করে
কত জনের কাজ করে দিয়েছি, কেউ আমার কাজের মূল্য দেয়নী,
সারাদিন পরিশ্রম করেছি শুধু এই জীবন বাঁচাবার জন্য! মা-বাবা কে খােজ
করেছি কত জনের কাছে, জিজ্ঞাসা করেছি কোথায় আমার মা-বাবা?
তাদের শেষ ঠিকানা পেয়েছি, এইটা মায়ের কবর, আর ঐ টা বাবার
কবর, তখন আমার বয়স সাত বছর!! তার পর মা বাবার কবরের পাশে
এসে বসে থাকতাম, এমনি করেই আমার বয়স এগারাে
শ্যামলী-৮১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
বছর গড়িয়ে গেলাে, অনেক দুঃখ পার হয়ে গেলাে, এক দিন আমি একা
মা-বাবার কবরের পাশে কত কিছু ভাবছিলাম, এমনি সময় পাশে এসে
দাঁড়ালাে নাসির চাচা, তখন আমি নাসির চাচাকে চিনতাম না, কোন দিন
দেখিনী। আমার পাশে এগিয়ে এসে বললাে-মা তুমি একা বসে কাঁদছে।
কেন মা?
আমি তখন চাচা বলে ডাকলাম—চাচা আমি তােমার চিনতে পারছিনা?
:-আমায় তুমি নিশ্চয় চিনতে পারবে, তুমি এখানে একা বসে কাদছাে কেন।
মা?
:-আমার তাে দুনিয়ায় আপন বলতে কেউ নেই তায় মা-বাবার কবরের।
পাশে এসে দাঁড়ালে কান্না আসে।
:-তােমার আর আপন কেউ নেই?
:-বললাম তাে এই দুনিয়ায় আমার আপন কেউ নেই।
:-একটু খানি ভাবিয়া নাসির খা কহিল-তুমি এখন থাক কোথায়, কার
কাছে?
শ্যামলী: চাচা একটু খানি দাড়াও, আমি বাহীর থেকে আসি।
দয়ালরে--- ও দয়াল--- দয়াল তােমার দুনিয়ায় সুখ দিয় সবার হৃদয়ে।
--------------কেউ থাকে রাস্তায় রাস্তায়--------------
--------------কেউ থাকে গাছ তলায়--------------
দয়াল-------------------------------------------- হৃদয়ে।
--------------বড় বড় অট্টালিকায়--------------
--------------তারা থাকে নিরালয়--------------
--------------আমি যেন পাই তােমার কাছে ঠায়--------------
দয়াল-------------------------------------------- হৃদয়ে।
--------------কারাে মন উড়ে বেড়াই--------------
--------------আমি দুঃখী তাই ঘুরে বেড়াই--------------
--------------শুধু থাকি তােমার আশায়--------------
দয়াল-------------------------------------------- হৃদয়ে।
--------------আমারে ফিরায়ে দিও না হয়--------------
--------------ধুকে ধুকে বেড়াই তােমার আশায়--------------
--------------তােমার দানে শুখে থাকবে আমার হৃদয়--------------
শ্যামলী-৮২ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
দয়াল--------------------------------------------হৃদয়ে।
--------------পাপের বােঝা মাথায় নিয়ে--------------
--------------তােমার পানে আছি চেয়ে--------------
--------------পরাে জনমে তােমার দেখা যেন পায়।--------------
দয়াল--------------------------------------------হৃদয়ে
-------------- এই জনম পার হয়ে যাবে হাসি তামাসায়--------------
-------------- পরাে জনমে তােমার সাথে দেখা যেন পায়। --------------
দয়াল--------------------------------------------হৃদয়ে।
(আমার বাড়ীর দরজায় আসিয়া এই গানটা আর কোনদিন গাইবে না,
-----এই গানটা শুনলে আমি সহ্য করতে পারিনা)
ভিক্ষুক বল্ল না মা না,আমি আর কোন দিন তােমার দরজায় এসে
--------------গাইবাে না।)
: -তখন আমার চোখে পানি আসিয়া পড়িল কোন কথা বলিতে পারছিনা,
কিছুক্ষন পর আমি বললাম- আমার থাকবার জায়গার কথা বলছ?
-হ্যা তুমি রাত্রে থাক কোথায়, কার কাছে?
:-তখন আমি কোন কথায় বলতে পারছিনা, আবারও বলিল তুমি থাক
কোথায়?
:-আমার থাকবার জায়গার ঠিক নেই, যে খানে আল্লাহ রাখে আমি সে
খানেই রাত্রি থাকি, যেখানেই থাকতে চাই, যার কাছেই থাকতে চাই,
সেই আমার দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়, কাছে করে কেউ রাখতে চাইনা,
অনেক অনুরােধের পর জায়গা করে দেয়, তখন তার কাছেই থাকি,
সকাল হলে আবার চলে যায়।
:-একটু খানি কি যেন ভাবলাে নাসির খা, তারপর বলিল- আচ্ছা, এই
শীতের রাতে তােমার কথা আছে?
:-না আমার কথা নেই, দুইটা চটের বস্তা আছে, একটা পাড়ী আর
একটা গায়ে জড়িয়ে থাকি।
:-তােমার খুব শীত লাগে?
:-না আমার তেমন শীত লাগে না।
:-তুমি আমার বাড়ী যাবে?
:-তােমার বাড়ী গেলে আমার জায়গা দেবে?
শ্যামলী-৮৩ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-তুমি যদি যাও তবে আমি জায়গা দেব।
:-আমার কাজের বিনিময়ে খেতে দেবে?
:-আমি তােমার সবই দেবাে, তুমি চলাে।
:-তুমি একটু দাঁড়াও তােমার সঙ্গে যাব, আমার মা-বাবার কবর সালাম
করে আসি, তারপর আমার পিতা-মাতার কবর সালাম করিলাম, তখন।
আমার চোখে পানি।
:-আমি বড় কষ্ট পাচ্ছিলাম, আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললাে
নাসির খা-খুকি তুমি কেঁদ না, দেখ আল্লাহ তােমার উপর রহমত
করবেন, চলাে এবার আমার সঙ্গে, তােমার আর কোন দুঃখ থাকবে না,
তুমি আমার মেয়ের মত।
:-তারপর ঐ নাসির চাচার কাছে চলে গেলাম, নাসির চাচা আমাকে তার
নিজের মেয়ের মত করে ভালাে বাসতাে, এমনি করেই ঐ খানে আমার
পাঁচটি বছর রয়ে গেল মহা সুখে, বাবা যা করতে পারিনী আমার জন্য
নাসির চাচা তা করতে পেরেছে, বুবু আমার জীবন কেমন হয়তাে কিছুটা
ভাবতে পারছাে?---------------- !!!
:-দুঃখের সঙ্গে শ্যামলী কহিল-তােমার জীবন একটা নাটক।
: -না বুবু আমার জীবন একটা নাটক হতে পারে না!, আমার শুধু আমি,
আমার আর কেউ নেই, কিছুই নেই, শুধু মাত্র একটা জীবন নিয়ে একটা
নাটক হয়না, তার পিছনে অনেক কিছু থাকার প্রয়ােজন থাকে, শুধু
একার জন্য নাটক লিখলে নাটক মানায় না, একটা সর্বহারা মানুষের
দুঃখ আছে, বড় আঘাত আছে..................... নেই সুখ, নেই শান্তি,
নেই কোন আশা.................., বুবু তাকে নিয়ে কেমন নাটক হতে
পারে!!
:-তােমার নিয়ে যদি কেহ নাটক নাই লেখে তবুও তােমার জীবনটা
নাটকীয়........
:-থাক ওসব কথা, সময় দুপুর গড়িয়ে গেলাে মা-বাবার কবর জিয়ারত
করে বাড়ীর দিকে চলাে।
:-পিতি তােমার দুঃখের কথাগুলি শুনতে আমার বড় ইচ্ছা হচ্ছে, তুমি
বলাে আমি শুনি....
:-এখন থাক বাড়ী গিয়ে আজ রাতে যতটা বলতে পারি তােমাকে
শ্যামলী-৮৪ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
শুনাবাে।
:-তােমার মনের বাইরে আমি যাব না, তুমি যখন বলবে আমি তখন
র কবর জিয়ারত করে বাড়ীর পথে রওনা করিল এবং চিন্তা করিল
কিচক্ষন, তার পর সাজুর বাড়ীর পাশ দিয়ে যাবে, সাজুর সঙ্গে দেখা
কররে দেখা যদি নাই হয় তবে ফাতেমার কবর জিয়ারত করবে, তার
পর বাড়ী যাবে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় এসে পড়ল ফাতেমার কবর
পাশে, দেখিল সাজু একা দাঁড়িয়ে আছে! নিঃসঙ্গ হয়ে মায়ের কবর পাশে
দাঁড়িয়ে আছে সাজু, তখন সাজুর বুক ভরা দুঃখ, চোখে অশ্রু বন্যা বয়ে।
চলেছে, পাশে আর কেউ নেই, কিছুক্ষন পর সাজু বসিয়া পড়িল, মুখে
তার কোন কথা নেই, পিতা মারা যাবার পর মা তার সব কিছু, মা ছাড়া
তার আপন কেউ ছিল না, যারা আপন ছিলাে তারা তখন ছিলাে অনেক
দূরে।
:-মা তুমি আমার ছেড়ে চলে গেলে? বাবা মারা যাবার সময় আমি কোন
দুঃখ পায়নী, আজ আমি বড় কষ্ট পাচ্ছি, ভাই নেই, বােন নেই, কারাে
কাছে দাঁড়াবার জায়গা নেই! আমি আজ একা হয়ে পড়েছি, আমার
ব্যাথা আমারই বুঝতে হবে, কে আর বুঝবে আমার বেদনা, পিছনে
দাঁড়িয়ে আছে, শ্যামলী ও পিতি। সাজু তা মােটেই বুঝতে পারিনী, যদি
আপন করে কেউ ভালােবাসতাে, তবে সে এসে দাঁড়াতাে, ততক্ষন
আমার পাসে এসে আমার সঙ্গে কথা বলতাে, তখন আমি তােমার ভুলে
থাকতে পারতাম।
:-শ্যামলী কহিল- সাজু ভাই দুলি কোথায়?
:-পিছনে তাকিয়ে দেখিল শ্যামলী ও পিতি--------চোখের পানি মুছিয়া
সাজু কহিল- শ্যামলী--- -----!!
:- খালারা বাড়ী চলে গেছে, তােমাকে একা ফেলে ওরা বাড়ী চলে।
গেছে?
:- হাঁ ওরা বাড়ী চলে গেছে আমি ওদের মনের কথা সব বুঝতে পেরেছি,
আমার কাছে ওরা কি চাই, শ্যামলী, তুমি কি কিছু বুঝতে পেরেছ?
:- একটু চুপ থাকিয়া শ্যামলী বলিল- আমি জানি না, তােমার কাছে ওরা
কি চাই, চলাে বাড়ী চলাে কবরের পাসে একা থাকতে নেই।।
শ্যামলী-৮৫ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- তােমরা যখন এসেছ তখন আমার বাড়ী যেতে হবে, আমার কাছে।
এসেছ খুব ভালই হয়েছে, চলাে বাড়ী চলাে! পিতির সঙ্গে নিয়ে যাও
আমি একটু পরে আসছি। না, আমি একটু পরে আসছি, পিতি তুমি সাজু
ভাইকে সঙ্গে করে বাড়ী যাও, আমি খালার কবর জিয়ারত করে আসছি,
বুবু আমিও খালার কবর জিয়ারত করবাে, কথা গুলাে বলিল পিতি।
শ্যামলী বলিল- পিতি তুমি কবর জিয়ারত করবে? তবে এসাে আমরা
সবাই মিলে খালার কবর জিয়ারত করি, তারপর সবাই কবর জিয়ারত
করিল, সাজু ভাই চলাে আমার বাড়ীতে যায়, তুমি যাবে না আমার।
বাড়িতে?
:- না, আজ যাব না অন্যদিন যাব, তুমি আমার ওখানে চলাে অনেক কথা
আছে।
:- কথা গুলাে কি আজ না বলিলে নাই, কথা গুলাে আজ না বলিলে কাল।
বলতে হবে, আজ বলিলে সব চেয়ে ভালাে হবে, আমি ছাড়া ঐ কথা।
গুলাে তােমার কাছে কেউ বলবে না।
:- শ্যামলীর কথা গুলাে শুনিয়া সাজু ভাবিতে লাগিল, কোন কথা বলবে,
আমি কিছুই ভাবতে পারছি না, বর্তমানে আমার সবাই নানা কথা বলছে,
আমি যে কাহারও কথায় জবাব দিতে পারছি না, কেউ কি তা বুঝতে
পারছে না, এই সময় কেন এত প্রশ্ন!
:- শ্যামলী বলিল, তুমি এত কি ভাবছ সাজু ভাই?
:- না, আমি এমন কিছু ভাবছি না, কিন্তু তুমি কি বলবে বলাে?
:- খালা আমাদের ছেড়ে চলে গেলাে, তার ক্রিয়া কাজ করতে হবে,
পরকালে শান্তি পাবে এমন কিছু যে, সমাজের মানুষ করে থাকে এমন
কিছু।
:- তুমি ঠিক কথাটা বলেছে আমিও তায় ভাবছি, কিন্তু কিভাবে করবাে
তাই ভাবছি।
:- প্রবীন মানুষ নাসির চাচার কাছে গেলে সদুউপদেশ দেবে, চলাে।
আমরা নাসির চাচার কাছে যায়।
শ্যামলী-৮৬ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- চলাে আজই নাসির চাচার কাছে যাব, নাসির চাচা কি উপদেশ
তার কাছে গেলে সব জান্তে পারব, ওরা সবাই নাসির খায়ের কাছে
চলিয়া গেলাে, সাজু চলতে চলতে ভাবিতে লাগিল------
আমি আজ শ্যামলীর কাছে মিথ্যা কথা বলিলাম!, মায়ের নিষেধ ছিলাে
জীবন গেলেও কখনও মিথ্যা বলবে না, কিন্তু আজ আমি মায়ের নিষেধ
অমান্য করিলাম, শ্যামলীর কাছে কেন মিথ্যা বলিলাম, আজ আমি মায়ের
শেখানাে কথা পালন করতে পারলাম না-----------, অতীতের
আরাে কত কথা ভাসিয়া আসিতে লাগিল সাজুর হৃদয়ে, মুখে কোন কথা
নেই, এমনি করিয়া ভাবিতে ভাবিতে শ্যামলীদের বাড়ীতে আসিয়া পড়িল
সবাই, দেখিতে পাইল নাসির খা, কয়েক জোন লােক নিয়া কি যেন গল্প
করিতেছে, এমন সময় নাসির খাঁ সামনে তাকাইল, দেখিতে পাইল সাজু,
শ্যামলী ও পিতি আসিতেছে, সাজুকে দেখিয়া ওরা সবাই গল্প বন্দ করিয়া
দিল।
:-শ্যামলী কাছে আসিয়া কহিল- চাচা তুমি কখন এসেছ?
:-নাসির খা শ্যামলীর কথার কোন জবাব দিলাে না।
:-সাজুকে কহিল- বাবা তুমি আর দুঃখ করাে না!
:-সাজু, নাসির খায়ের কথায় উত্তর দিতে পারিল না, দু'চোখ বেয়ে অশ্রু
বাহির হইয়া আসিল!
:- বাবা এই দুনিয়া ছেড়ে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে, দুনিয়ায় শুধু
আশা আর যাওয়া চিরদিন কেহই রবে না।
:-সাজু নাসির খায়ের জড়িয়ে ধরিল কহিল- চাচা, আমার বলতে যে আর
কেহই থাকবে না।
:- অত ভেঙ্গে পড়াে না বাবা, আমার-মা বাবা ছিলাে, তারা এখন আর
নেই, আমি বেঁচে আছি!, যেমন তােমার বাবা অনেকদিন আগেই এই
কাল ছেড়ে পরকালে চলে গেছে, তুমি বেঁচে আছ, তােমার মা মারা গেছে।
তাই কি হয়েছে, একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে সবার চলে যেতে হবে, তুমি
দুঃখ করছ কেন? তােমার মায়ের সৎ কাজ কর পরকালে যেন তারা শান্তি।
পাই।
:- চাচা কিভাবে যে করবাে সেই চিন্তা করছি----------------
শ্যামলী-৮৭ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:- তােমার চিন্তা করতে হবে না, আমরা তাে আছি, নাসির খায়ের মুখের
বানি কাড়িয়া লইল শ্যামলী।
:-শ্যামলী বলিল, তােমার কাছে নিয়ে এসেছি।
:- ভালােই করেছ মা খুব ভালাে করেছ।
:-শ্যামলী কি যেন একবার ভাবিল তারপর বলিল- খালার ক্রিয়া কাজ
সম্পূর্ণ আমিই করবাে।
:-নাসির খা শ্যামলীর চোখ ও মুখের দিকে এক নজরে চেয়ে রইলাে,
কিছুক্ষণ পর নাসির খা বলিল- শ্যামলী তুমি এই কাজ নামাতে পারবে?
:-শ্যামলী বলিল- পারতেই হবে আমার, সে যে আমার মা----------
কেন পারবাে না!, যার কাছে পেয়েছি আদর-সােহাগ ভালােবাসা, তার
ক্রিয়া কাজ কেন করতে পারবাে না! কেউ না পারলে আমার পারতেই
হবে।
:-তখন সাজুর দু’চোখে অশ্রু ছল ছল করছিলাে শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে
সাজু বলিল- শ্যামলী তুমি যে আমার মায়ের কতখানি ভলােবাস তা আমি
আজ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু---------।
:-নাসির খা কহিল- কিন্তু------ মানে------------
সাজু বলিল- কিন্তু মানে আমি বলতে পারব না, আমি এই সত্য কথাটা
কোনদিনই বলতে পারব না! যদি সত্য কথাটা বলতে পারতাম তবে
আজ এখন বলে ফেলতাম, কিন্তু আমি তা বলতে পারব না, যে কথা
বলতে শ্যামলী অনেক দুঃখ পাবে, সে কথা আমি বলতে রাজি নাই, সত্য
কথাটা সারা জীবনভর চাপা থাক।
:-সাজুর দিকে তাকীয়ে শ্যামলী বলিল- সাজু ভাই তুমি যে কথাটা বলতে
চাচ্ছ না, যদি বলতে নাই পার তবে বলার আর দরকার নেই, এখন
মায়ের জন্য যদি কিছু করি তবে তােমার কি অমত আছে?
:- না, আমার কোন অমত নেই, মায়ের জন্য তুমি যা কিছু করাে আমি
কোন অমত করবাে না, আমার ভিতরে বিন্দু মাত্র অমত থাকতে পারে
, আমার মা তােমার মা ছিল সেই মায়ের জন্য কিছু করতে গেলে আমি
শ্যামলী-৮৮ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
জানতে পারবাে, তােমার মায়ের সৎ কাজ তুমি মেয়ে হয়ে করতে
চা আর আমি ছেলে হয়ে পারছি না, আমার মায়ের জন্য তুমি সব।
কিছু।
:-শামলী কহিল অত কথা থাক, ক্রিয়া কাজ যখন করতে হবে, তখন
সেখানে থাকবে, খালা ও দুলি সহ এখানে আমরা যারা আছি সবাই
থাকব।
:-নাসির খাঁ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলিল-সাজু, তুমি তােমার খালা
ও খালুর সংবাদ দিয়ে নিয়ে এসাে এই কাজের ভিতরে ওদের থাকার
একান্ত দরকার।
:-সঙ্গে সঙ্গে সাজু উত্তর করিল-চাচা, আমি ওদের খবর দিয়ে নিয়ে।
আনছি। -খুবই তাড়া তাড়ী মাথার বুঝা নামিয়ে ফেলা ভালাে, তুমি আজই
তােমার খালুর বাড়ী চলে যাও, আর আমরা গ্রাম বাসী সবাই এক সঙ্গে
মিলে তােমার মায়ের ক্রিয়া কাজ নামিয়ে দিবার সিদ্ধান্ত নিই, তােমার
এই বােঝা আমরা সবাই মিলে নামিয়ে দেব।
:-সাজু কিছু সময় নিরব থাকিয়া কহিল-চাচা আমি শ্যামলীর কাছে।
একটা মিথ্যা কথা বলেছি।
:-শ্যামলীর কাছে তুমি মিথ্যা কথা বলেছ?।
:-হা চাচা আমি শ্যামলীর কাছে মিথ্যা বলেছি।
:-কি মিথ্যা বলেছ?
:-বলেছি, খালা আর দুলি ওরা বাড়ী চলে গেছে, ওরা বাড়ী বায়নী
আমার বাড়ীতেই আছে।
:-ওহ, ওরা তা হলে তােমার বাড়ীতে আছে?
:-হ্যা।
:-তােমার খালা যদি এখানে থাকে তবে আর যেতে হবে না, ডাকলে তাে
এখানেই আসবে।
:-শ্যামলী কহিল-এখন তাদের ডাকতে যাবে কে?
:-নাসির খা বলিল-আমিই যাচ্ছি, বলিয়া নাসির খা চলিয়া গেল।
শ্যামলী-৮৯ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-সাজু বলিল-তােমার কাছে আমি মিথ্যা বলেছি, হয়তাে তুমি আমার
উপর রাগ করেছ? -না, তােমার উপরে আমার কোন রাগ নেই।
:-তুমি সত্যি বলছ?
:-আমি কোন দিন মিথ্যা বলি না, আর এই জীবনে তােমার কাছে কোনাে
দিন মিথ্যা বলব না, এই আমার মনের কথা, কিন্তু তুমি আমার কাছে
মিথ্যা বলতে পারলে? কি দরকার ছিল মিথ্যা বলার, থাক এ সব কথা,
এখন যা বলার প্রয়ােজন তাই বলি।
:- শ্যামলী তুমি ও তােমরা যা বলবে এখন, আমি তাই শুনবাে, বলাে কি
বলবে?
:- নাসির চাচা তাে খালার কাছে গেলাে কিন্তু তিনি যে কি বলবে, এসে
আমি ভাবতে পারছি না।
:- অত ভাববার দরকার নেই, আল্লাহ সব সমাধান করে দেবেন, তা
ছাড়া ভেবে আর কি হবে বলাে?
:- সাজু ভাই, ভাবতে আমার হবেই, কারণ খালা আমার ভালাে চোখে
দেখে না, কি যেন মনে করে, সব কথা থাক খাবার ঘরে চলাে পিতি
টেবিলে ভাত রেখে ডাকছে।
:- আমি এখন খাব না, একটু পরে খাব
:- না তা হয় না, ভাত রেখে অন্য কিছু করা যায় না, ওরা আসুক তারপর
কথা বলা বলি হবে। :-শ্যামলী, সাজুর হাত ধরে নিয়ে খাবার ঘরে গেল।
*****************************************
:-আকলিমা ও দুলি সাজুকে খুঁজে পাচ্ছে না, একবার একটু ভাবিয়া।
লইলাে, আকলিমা দুলিকে জিজ্ঞাসা করিল-সাজু কোথায় গেলাে একটু
আগে মায়ের কবরের পাশে বসে থাকতে দেখলাম কিন্তু গেলাে কোথায়?
আমি তাে কিছুই বুঝতে পারছি না, কথাগুলাে বলছিলাে আকলিমা।
:-আকলিমার মুখের কথা কাড়িয়া দুলি কহিল- আমি তাে কিছুই আন্দাজ
করতে পারছি না।
শ্যামলী-৯০ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
:-তবে কি সে শ্যামলীর কাছে গেলাে?
লােকে নিয়ে আমি আর পারি না, আমরা থাকতে কেন সেখানে যাবে।
আর গেলে তাে খারাপ হবে, তুই বাড়ীতে থাক আমি শ্যামলীর কাছে
গেলাম।
:- না মা তুমি ওখানে যেও না।
-আমি গেলে তাের ক্ষতি কি? আমি যাচ্ছি তাের ভালাের জন্যেই, আর।
কারাে জন্য নয়। -না মা তুমি গেলে ক্ষতি হবে, তুমি যেও না।
:-আমি গেলে লাভ হবে-কি ক্ষতি হবে জান্তে পারি?
:-মা তুমি কি পাগল হয়ে গেছ, এই সময় সাজু ভাই, সব সময় মন
খারাপ করে থাকে, একা একা বসে থাকে, শ্যামলী বুবুর কাছে গিয়ে যদি
একটু শান্তি পায়, তার কাছে গেলে দোষ কি? তুমি বাড়ীতে থাক আমিই
হয় যাচ্ছি। যদি সাজু ভাই থাকতে চাই তবে রেখে আসবাে, আর যদি
আসতে চাই সঙ্গে করে নিয়ে আসবাে।
-তুই একটা পাগল মেয়ে, তাের আজো বুদ্ধি হলাে না।
:-আমি গেলেই আমার সঙ্গে আসবে, তুই গেলে হয়তাে থেকে যাবে,
তার চেয়ে আমিই যায়।
: -মা তুমি যা ভালাে মনে করাে, তাই আরাে আমার একটু ভাবতে দাও
কি করা যায়, আমি খালার কবর পাশে গেলাম যদি ঐ দিকে কোথাও
থাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবাে।
:-আকলিমা শ্যামলীদের বাড়ীর পথে চলিল।
:-দুলি ফাতেমার কবরের পাশে গিয়া দাঁড়াইল, তার পর এদিক ওদিক
তাকাইল, সাজুর কোনাে নিশানা পাইল না, আনমনা ভাবে শুধু ভাবিতে
লাগিল, শ্যামলীকে নিয়ে খালা কি চিন্তাইনা করতাে আমার চেয়ে খালা
শ্যামলীকে বেশী ভালাে বাসিত, খালা বেঁচে থাকলে, শ্যামলীকে সাজুর
সঙ্গে বিয়ে দিত আমার সঙ্গে নাই, আজ খালা বেঁচে নেই, তাই মায়ের
মুখে নানা কথা, এই সব কথা নিয়ে আমি কিছুই ভাবতে পারছি না, সাজু
ভায়ের এখন মহা বিপদের সময়, যদি আরাে বড় ধরনের।
শ্যামলী-৯১ পৃষ্ঠা ১৫৬।
শ্যামলী, লেখক- নুরুল আলম খােশনূর
দুঃখ দেওয়া হয়, তবে সে আরাে কষ্ট পাবে, এই দুঃখের সময় সাজ ভাই
মনে করে তাকে তাই করতে দেওয়া আমাদের কর্তব্য, আমরা
ছ করতে গেলে বা ভাবতে গেলে তাতে আরাে খারাপ হবে, সেই
ছােট বেলা থেকে সাজু আর শ্যামলীর মাঝে ভালােবাসা জমে আছে,
সেই ভালােবাসা আজো আছে ভুলে যাইনি, আজো ওরা একে অপরের,
আমি কেন তাদের মাঝখানে পথের কাটা হয়ে দাড়াব! আমি তা
কোনদিনই পারব না, শ্যামলী আজ আমাকে ছােট বােনের মত।
ভালােবাসে আদর করে, আপন বােন এমনি করে কোন ছােট্ট বােনকে
ভালাে বাসে না, আমি মায়ের কথা পালন করতে পারবাে না, এমনি
করেই ভাবিতে ছিলাে দুলি, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে।
: -এমনি সময় নাসির খাঁ কবরের পাশে এসে দাঁড়াইলাে দুলির পাশে,
কবরের সামনে, নাসির খা কবর খানা জিয়ারত করিল, তারপর দুলিকে
বলিল-তােমার মায়ের ডাক দাও অনেক কথা আছে।
:-মা তাে শ্যামলীর বাড়ীতে গিয়েছে।
:-তােমার মা শ্যামলীর বাড়ীতে গিয়েছে?
:-হা কিছুক্ষন আগে মা গেলাে, চলাে চাচা বাড়ীর ভিতরে তােমার সঙ্গে
আমার অনেক কথা আছে।
: -বলাে মা তুমি এখানে দাঁড়িয়েই বলাে।
: -অল্প কথা নাই চাচা, সে অনেক কথা।
:-অনেক কথা, আজ না হয় থাক অন্য দিন শুনব, আজ তােমার মায়ের।
কাছে এসেছি একান্ত দরকার।
:-চাচা তুমি কিছু সময় বসাে, সাজু ভাইয়ের খোঁজে গিয়েছে যদি ওখানে।
পায় তবে তাড়া তাড়ী চলে আসবে, সাজু ভাই কোথায় যে গেছে পাওয়া
যাচ্ছে না।
:-সাজু তাে ওখানেই আছে।
:-তবে আজ আমি যায় মা অন্য দিন এসে শুনে যাব।
:-মায়ের সঙ্গে কি দরকার চাচা?
:-সাজুর মায়ের ক্রিয়া করতে হবে।


